গরুর মাংস আর কলিজা কি এক?

0 106

রমজান উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে পশুর মাংস ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ একই দামে বিক্রির ক্ষেত্রে কোনও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এ অবস্থায় নির্ধারিত ‘মাংসের দামে’ অন্যান্য অঙ্গ বিক্রি না হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নও উঠেছে।

মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি পশুর সব অঙ্গের মূল্য এক হতে পারে না। মাংস আর কলিজা কখনও এক নয়।  মাংসকে মাংস বলা হয়, কলিজাকে মাংস বলা হয় না। কারণ, পশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন দাম হয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরে এই নিয়মেই চলে আসছে। বিশ্বজুড়েও এই নিয়ম সমাদৃত।

বুধবার দুপুরে ডিএমপি’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মশিউর রহমান এর নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি দল ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে রাজধানীর শান্তিনগরে অবস্থিত সুপার শপ মিনাবাজারকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এর মধ্যে মাংস ও কলিজা একই দামে বিক্রি না করায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানকালে মশিউর রহমান জানান, ‘গরুর মাংস ও কলিজার দামের পার্থক্য থাকায় মিনা বাজারকে এই টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মাংস ও কলিজার দাম ভিন্ন হতে পারে না।’

তবে তার এ যুক্তি মানতে পারেনি সুপারশপ মিনা বাজার কর্তৃপক্ষ। একই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর আরও কয়েকজন মাংস ব্যবসায়ী মত প্রকাশ করেছেন মাংসের দামে রাজধানীর কোথাও কলিজা বিক্রি হয় না। বরাবরই এর দাম একটু বেশি থাকে। এ কারণে সবখানেই মাংস ও কলিজা আলাদাভাবে বিক্রি হয়ে থাকে।

খিলগাঁও এলাকার প্রসিদ্ধ মাংস ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি পশুর শরীরে মাংস ছাড়াও কলিজা, হাড়, শিঙ, ক্ষুর, লেজ, দাঁত, রক্ত, পাকস্থলী, পিত্তথলি, অণ্ডকোষ,ফুসফুস, তিল্লি, ভুঁড়ি প্রভৃতি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। এগুলো মাংসের আওতায় পড়ে না। এর দামও ভিন্ন ভিন্ন। মাংসের দাম যা হবে দাঁত, শিঙ,ক্ষুর, ফুসফুস, তিল্লি, পিত্তথলির দাম তা হবে না। আর এগুলোর মধ্যে কলিজার দাম একটু বেশিই হয়। কারণ,তার চাহিদা বেশি।

গরুর কলিজা (ছবি-সংগৃহীত)

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি গরুতে যদি দেড় মণ মাংস হয় সেই গরুতে কলিজা হয় মাত্র ৪-৫ কেজি। সঙ্গত কারণেই কলিজার চাহিদা একটু বেশি। আর বাজারে যে জিনিসের চাহিদা বেশি সে জিনিসের দাম একটু বেশি হবেই। আর সিটি করপোরেশন তো কলিজাসহ অন্যান্য অঙ্গের দাম নির্ধারণ করে দেয়নি। তারা যদি সব কিছু একই দামে বিক্রি করতে বলে তাহলে তো আমাদেরই লাভ। কারণ,পিত্তথলি,ফুসফুস (ফ্যাপসা) ও তিল্লির দাম মাংসের দামের সমান নয়। বরং একই দামে বিক্রি করলে ক্রেতারাই ঠকবে।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দক্ষিণ বনশ্রীর মাংস ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা গরু জবাই করি ব্যবসা করতে। কোরবানি দিতে আসিনি যে গরুর মাংস, হাড়, কলিজা,ফুসফুসসহ সব কিছু একসঙ্গে মিলিয়ে বিক্রি করবো। আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই। ব্যবসা করতে এসেছি। এরপরেও সিটি করপোরেশন মাংসের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে আমরা সেই দামেই মাংস বিক্রি করছি। কলিজা বিক্রি করছি না। মাংসের দামে কলিজা বিক্রি করলে গ্রাহকের হাতে মার খেতে হবে। কারণ, সবাই কলিজা নিতে চাইলে আমি তো দিতে পারবো না।’

তিনি বলেন, একটা পশুর মধ্যে বহু অংশের মাংস থাকে। কাট অনুযায়ী কোনও কোনও অংশের মাংসের দাম  আরও অনেক বেশি পড়ে। কিন্তু এরপরেও আমরা সব মাংস একই দামে বিক্রি করি। কিন্তু মাংস ছাড়া পশুর অন্যান্য অংশ একই দামে বিক্রি হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, মাংসের দাম ৪৫০টা নির্ধারণ করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু,সব মাংসতো সমান নয়। এছাড়াও অল্প বয়সী ও বেশি বয়সী গরুর মাংস এক হতে পারে না। এখন যদি ৪৫০ টাকায় মাংস বিক্রি করতে হয় তাহলে সবাই বেশি বয়সী গরুর মাংস বিক্রি করবে। এরপরেও রমজানে নগরীতে কম বয়সী গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে একই দামে। আর হাড়বিহীন মাংসের দাম তো তুলনামূলকভাবে একটু বেশিই হবে। ক্রেতারা সব কিছু দেখে শুনে ক্রয় করেন। তাদের অভিযোগ না থাকলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযোগ কেন।

এর আগে, গত সোমবার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রিসহ নানা অভিযোগে বনানীতে সুপার শপ স্বপ্নকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেন, ‘তারা হাড় ছাড়া মাংস হাড়যুক্ত মাংসের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, পৃথিবীর সব দেশেই এমন নজির রয়েছে। হাড় ছাড়া মাংসের দাম আর অন্য মাংসের দাম এক হতেই পারে না।’

ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের এমন জরিমানার ঘটনাটি দেখে জার্মান প্রবাসী ও ডয়েচেভেলের সাংবাদিক আরাফাতুল ইসলাম তার ফেসবুকে মন্তব্য করেন। পরে তিনি এ  বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জার্মানির সুপার মার্কেটগুলোতে সাধারণত একটি গরুর দেহের বিভিন্ন অংশের মাংস আলাদা আলাদা দামে বিক্রি করা হয়। কলিজার দামও আলাদা হয়। এমনকি বাছুরের কলিজার দাম বড় গরুর কলিজার দামের চেয়ে অনেক বেশি। মাংসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাড় থাকে না। ফলে আমরা যারা ‘হাড্ডিওয়ালা মাংস’ খুঁজি তাদের মাংস কিনতে বেশ বেগ পেতে হয়। তুর্কি বা আরবি দোকানগুলোতে অনুরোধ করে সেরকম মাংস কিনতে হয়। এসব এখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।’

ভ্রাম্যমাণ আদালতের এমন অভিযানের বিষয়ে আরাফাত সিদ্দিক নামে একজন গণমাধ্যম কর্মী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘‘গরুর মাংস ও কলিজার দামের পার্থক্য থাকায় বুধবার শান্তিনগরে সুপার শপ মিনা বাজারকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে ডিএমপি’র ভ্রাম্যমান আদালত।’

তার এমন স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে মাহমুদ বিন আলম নামে একজন লিখেছেন- ‘মাংস এবং কলিজার ভেতর তো পার্থক্য আছেই এবং দাম এরও পার্থক্য হওয়া উচিত। কেননা একটা গরুর যদি ওজন হয় ১০০ কেজি সেক্ষেত্রে কলিজার ওজন হবে সর্বোচ্চ ৬/৭ কেজি যা মাংসের থেকে কম। সুতরাং কলিজাটা একটু বেশি দামেরই হয়। এটা পৃথিবীর সব জায়গায় এমন। কিন্তু উনারা আজগুবিভাবে ফাইন করছে বলে আমার মনে হয়।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.