চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ে অসহনীয় যানজট

0 90

চুয়াডাঙ্গা: দর্শনা থেকে প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছেড়ে যাওয়া দুরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহনের সংখ্যা শতাধিক। মালবাহী ওয়াগনে ভারত থেকে আমদানীকৃত বিভিন্ন পণ্য এনে নামানো হয় দর্শনা স্থলবন্দরের রেলইয়ার্ডে। এ পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের জন্য প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক চলাচল করে থাকে। তাছাড়া চলমান ভারী পরিবহনের সংখ্যা রয়েছে অসংখ্য। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে পুরাতন বাজার পর্যন্ত এ সড়কটি ব্যস্ত সড়কে রূপ নিয়েছে। ব্যস্ততম শিল্প শহর দর্শনায় আজও নির্মিত হয়নি টার্মিনাল। যে কারণে যত্রতত্র পরিবহন পার্কিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের। প্রায় ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। দেড়শ বছরের পুরাতন শহর দর্শনা ভৌগলিকভাবে সীমানা খুব দীর্ঘ না হলেও ইতিহাস, ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভূখন্ড গঠিত হওয়ার পূর্ব থেকেই অত্যান্ত সমৃদ্ধ একটি শহর। ১৯৩৮ সালে এশিয়ার মহাদেশের ২য় বৃহত্তর ও দেশের সর্ববৃহত কেরুজ চিনিকল দর্শনায় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভীত যেমন হয় মজবুত, তেমনই বাড়ে দর্শনার পরিচিতি। দর্শনায় কাস্টমস স্থাপিত হয় ১৯৫৮ সালে। পরপরই ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম বাংলাদেশের ভূখন্ডে দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত ৫৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার রেলপথ করা হয় নির্মাণ। সেই থেকে ‘দর্শনা জংশন’ দেশের বুকে আলাদা একটি গুরুত্ব নিয়ে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। দর্শনায় দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক রেলপথ যার মাধ্যমে ১৯৬৫ সালের পূর্বে ভারতের সাথে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয় দর্শনা স্টেশন থেকে। বর্তমানে যা দর্শনা আন্তর্জাতিক স্টেশন নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় দর্শনার ভূমিকা ইতিহাসের মানচিত্রে আজও সমাদৃত। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে পারাপার ও প্রশিক্ষণের ট্রানজিট পয়েন্ট ছিলো দর্শনা। সরকারের কোষাগারে রাজস্ব দেয়ার দিক থেকেও দর্শনা অনেক এগিয়ে। কেরুজ চিনিকল, ডিস্টিলারী বিভাগ, রেলস্টেশন, কাস্টমস, ব্যাংক, বীমা, ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন সরকারি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর সরকার প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। দর্শনার এক সময়ের প্রশাসনিক পরিচয় ছিলো ইউনিয়ন যা ১৯৯১ সালে পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে দর্শনা পৌরসভা ‘২য় শ্রেণির’ মর্যাদাপ্রাপ্ত। রাজনৈতিকভাবেও দর্শনার অবস্থান বেশ মজবুত। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি আলী আজগার টগর, চুয়াডাঙ্গা জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদুল ইসলাম আজাদ, জেলা পরিষদের সাবেক প্রসাশক মাহফুজুর রহমান মঞ্জু, দর্শনা পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান, বিশিষ্ট শিল্পপতি হাজি ইঞ্জিনিয়ার মোখলেসুর রহমান তরফদার টিপুসহ বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের বসবাস দর্শনায়। অথচ দর্শনা উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বছর দেড়েক আগে দর্শনা বাসস্ট্যান্ড সরকারি জমি নির্ধারণ করা হয় টার্মিনালের স্থান। টার্মিনালের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করা হয় সে সময়। জেলা পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থমকে যায় টার্মিনাল নির্মাণ কাজ। কি কারণে টার্মিনালের কাজ থমকে গেলো তা বোধগম্য নয় সাধারণ মানুষের। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে পুরাতন বাজার পর্যন্ত সড়কটি তুলনামূলক সরু। সড়কের দুধারে দোকানীরা অতিরিক্ত টিনের চালা দেয়ায় সড়ক আরও বেশী সরু হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ ও মালামাল ভর্তি ট্রাক ওজনের ডিজিটাল স্কেল সড়ক ঘেষে নির্মাণ করায় সমস্যা আরও বাড়ছে। দর্শনা থেকে প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যাতায়াত করে থাকে ৮০টি পরিবহন। দর্শনার প্রাণকেন্দ্র রেলবাজার এলাকায় সড়ক ঘেষে এসব পরিবহন কাউন্টার। বিশেষ করে পূর্বাশা ও রয়েল পরিবহন খুব বেশী হওয়ায় সর্বক্ষণিক কোনো না কোনো বাসযাত্রীকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। দর্শনা জয়নগর সীমান্ত পথে ভারত যাতায়াতকারী সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেড়েই চলেছে যাত্রীবাহী পরিবহনের সংখ্যা। এছাড়া দর্শনা স্থলবন্দর থেকে ভারতীয় আমদানীকৃত পণ্যভর্তি ট্রাক চলাচলের সংখ্যা শতাধিক। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ও পিকনিক স্পট মুজিবনগর, ৮ শহীদের কবর পরিদর্শনে প্রতিদিন অসংখ্য পরিবহন চলাচল করে থাকে এ সড়কেই। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে পুরাতন বাজার পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার সড়কের মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রেলবাজার ও পুরাতন বাজার। এ ছাড়া রয়েছে কি-ারগার্টেনসহ বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ। নেই কোনো গতিরোধক। জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটির ওপর দিয়েই রয়েছে ১৮৬২ সালের নির্মিত রেলগেট। প্রতিদিন ঢাকা-কোলকাতাগামী যাত্রীবাহী মৈত্রী ট্রেনসহ অসংখ্য মালবাহী ওয়াগন চলাচল করে থাকে। এছাড়া সড়কের ওপরেই দীর্ঘসময় পরিবহন দাঁড় করিয়ে আদায় করা হয়ে থাকে পৌর টোল। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ দেড় কিলোমিটার সড়ক সর্বক্ষণই ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। চরম ভোগান্তি পোয়াতে হয় সাধারণ মানুষকে। পরিবহনসহ বিভিন্ন খাত থেকে সরকার প্রতি বছর শ’ শ’ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হলেও উন্নয়নের ছিটেফোঁটা ছোঁয়া লাগেনি এ শহরে। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড ও পুরাতন বাজারে দুটি ট্রাফিক আইল্যা- নির্মাণ করা হলেও আজ পর্যন্ত নিযুক্ত করা হয়নি ট্রাফিক পুলিশ।
এ বিষয়ে দর্শনা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব গোলাম ফারুক আরিফ জানান, দর্শনা শহরে রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কারনে শহরের ছোট ছোট যানবাহন চলাচলে যানজটের সৃষ্টি হয়। দর্শনা শহর থেকে দূরপাল্লার বাস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেড়ে যায়। এখানে কোনো বাসটার্মিনাল না থাকায় রাস্তার ওপরই বাসগুলো পার্কিং করে রাখা হয়। এটাও যানজটের মূল কারণ। যানজটমুক্ত করতে দর্শনায় বাসটার্মিনালসহ রাস্তার দু’ধারে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ জরুরি।
দামুড়হুদা উপজেলা জাসদ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম লুল্লু জানান, দর্শনা শহরে ব্যাটারিচালিত অটো ও ভ্যানগাড়ি রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আবার অনেকেই যানজটের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান হওয়া দরকার। এ বিষয়ে পৌরসভার ১নং প্যানেল মেয়র রবিউল হক সুমন দর্শনা শহরে যানজটমুক্ত করতে রাস্তাপ্রশস্ত করার জন্য ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। খুব শিগগিরই এর বাস্তবায়ন করা হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.