ক্রিকেট শুধু অনুশীলনের নয়, দর্শন এবং আত্মোপলব্ধিরও

0 14

ডেস্ক: মোহাম্মাদ কাইফের কথা মনে আছে? ২০০৩ সালের দিকে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম একজন স্তম্ভ ছিলেন। রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে তার ফিনিশিং জুটি আমার কাছে সে সময়ের অন্যতম প্রিয়। যদিও তখন পাকিস্তানের সমর্থক না হলেও ওয়াসিম- শোয়েবের বোলিং কেমন একটা শিহরণ জাগাত। বিশেষত ওয়াসিম ক্রেজের জন্য ক্রিকেটের প্রতি আসক্তিও প্রথম।

তারপরেও কাইফের ব্যাটিং এবং ফিল্ডিং ঠিক একইরকম শিহরণ নিয়ে আসতো। সেরা ফিল্ডিং বলতে বুঝতাম কাইফকে। এশিয়ানদের বাইরের খেলোয়াড়দের সম্পর্কে জানাশোনা আরো এক বছর পর। যখন ভারত বিদেশি দলগুলোর বিপক্ষে অনেক খেলতো তখন বিদেশি খেলোয়াড়দের সামর্থ্য জানতে পারি।

সেই কাইফ একদিন ভারতের দল থেকে বাদ পড়ে গেলেন। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে জানলাম, কাইফকে ভাবা হতে ভারতের পরবর্তী অধিনায়ক। যুব বিশ্বকাপ দাপিয়ে এসেছিলেন। ব্যাটিংটা ঠিক ওই সময়ের কিংবদন্তীদের মতো স্টাইলিশ নয়, কিন্তু রান করতে পারে। একই সঙ্গে ঠান্ডা মাথা, অসাধারণ ফিল্ডিং। সব মিলিয়ে দারুণ প্যাকেজ।

কয়েকদিন আগে তার এক সাক্ষাৎকার দেখেছি। তাতে ক্যারিয়ারকে বড় করতে না পারা সম্পর্কে বলেছিলেন, যখন খারাপ সময়টা এলো তখন বুঝতে পারছিলাম না সমস্যা কি?

মনে হচ্ছিল সবই তো ঠিক আছে। আমি যাদের (শচীন, সৌরভ, লক্ষণ) সঙ্গে খেলেছি- এরপরও আমার ক্যারিয়ার এখানে থেমে যাওয়া সম্পূর্ণ আমার ব্যর্থতা। আমি যদি সিনিয়রদের একদিন ডিনারে ডাকতাম আর ভুল নিয়ে আলাপ করতাম; তবে নিশ্চয়ই কারণটা বুঝতে পারতাম। কিন্তু আমি তাই করছিলাম যা আগেও করেছি। আমার উচিত ছিল অন্যদের সঙ্গে কথা বলা।
কাইফের এ বক্তব্য পড়ামাত্র বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড়ের কথা মনে পড়েছে। যাদের অনেক দূর যাওয়ায় কথা ছিল। একের পর এক খারাপ পারফর্ম করার পরেও সাংবাদিকদের তারা বলেছেন, সমস্যা তো কিছু দেখছি না। কিন্তু শুধু রানটাই পাচ্ছি না।

সাকিব একবার রান পাচ্ছিলেন না। খুব সম্ভব আইপিএলের মধ্যে। দুম করে সালাহউদ্দিন স্যারের কাছে গেলেন এবং রান পেলেন। শ্রীলংকার বিপক্ষে শেষ সেঞ্চুরির আগে মমিনুলের ব্যাটিং বেশ বাজে যাচ্ছিল। সেই একই ব্যক্তি স্মরণ এবং শতক।

২০০৪ সালে সম্ভবত ভারতের বিপক্ষে ১৫৬ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেছিলেন মোহাম্মাদ আশরাফুল। সেই ইনিংসের আগে ব্যাটিং টিপস দিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকার।

বাংলাদেশ সফরে আসার আগে ইংলিশ ব্যাটসম্যান কেভিন পিটারসেন ফোন দিয়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়কে। বাঁহাতি স্পিনে পিটারসেনের দুর্বলতা তখন সার্বজনীন। সাকিব-রাজ্জাককে আটকাতে দ্রাবিড়ের যন্ত্রণা নিয়েছিলেন তিনি। এরপর এখানে এসে শতকও পান তিনি।
আমি বলছি না যে, একদিনেই হয়তো কোচ বা সিনিয়র ক্রিকেটাররা অনেক কিছু শিখিয়ে ফেলবেন। কিন্তু হয়তো এগুলোতে একটা ম্যাজিক থাকে। ক্রিকেটে বহুবার এমন ঘটনা ঘটে, ছোট্ট একটু পরিবর্তন অনেক সময় বড় সফলতা এনে দেয়।

শচিন টেন্ডুলকারের সাক্ষাৎকার অথবা বায়োগ্রাফি কোথায় যেন দেখেছিলাম। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ২০০৫-০৬ এর দিকে এক সময় রান পাচ্ছিলাম না। সমস্যা ধরতেই পারছি না৷ একটা কিশোর ছেলে আমাকে বলেছিল, আমার হ্যান্ড প্যাডে সমস্যা আছে। ওটা এডজাস্ট হচ্ছে না। ঠিক করে নিলেই রান পাবো। পরে যখন গভীরভাবে ভাবলাম মনে হলো ওটা আমার মনসংযোগ নষ্ট করছিল শেষ সময়ে।

ওটাই শচিনকে রানে ফিরিয়েছিল এমন নাও হতে পারে। কিন্তু অবশ্যই একটা মানসিক দ্বন্দ দূর করেছিল৷
সাম্প্রতিক এশিয়া কাপের ফাইনালে মাশরাফির একটি ভিডিও বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। লিটন দাস ফাইনালের আগে পুরো এশিয়া কাপেই ছিলেন ফ্লপ পারফর্মার। ফাইনালে অর্ধশতকের পর আক্রমণে গেলেন। ক্যাচ উঠলো। কিন্তু তালুবন্দি করতে পারলেন না ফিল্ডার। যখন জীবন পেলেন তখন প্যাভিলিয়নের করিডোর থেকে অধিনায়ক মাশরাফি বুকে সাহস রেখে ইনিংসকে বড় করতে বললেন। এক মুহূর্তে ছটফট করতে থাকা লিটন দাস যেন হয়ে উঠলেন অভিজ্ঞ একজন ক্রিকেটার। যদি এই ইনিংসটিই তার ধ্যান ধারণাকে ভাবাতে পারে তবে নিশ্চয় সে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

সাম্প্রতিক কিছু ক্রিকেটার বাংলাদেশে এসেছিলেন অমিত প্রতিভাধর হিসেবে। তাদের সবারই বড় পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভবনা ছিল। কিন্তু পারেননি। দল থেকে বাদ পড়েছেন। এখনো হয়তো নিজেকে নিয়ে সেভাবে ভাবেননি। আগামি ১০-১৫ বছর পর হয়তো কাইফের মতো তারাও আফসোস করবে। ইশ! যদি একবার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতাম। যদি কারো সঙ্গে কথা বলতাম।

কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকারের আত্মজীবনীকে বলা হয় ক্রিকেটের এ,বি,সি,ডি। রানের জন্য, ফর্মের জন্য তিনি কতজনের সঙ্গে আলাপ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি বিরাট কোহলি কিংবা কিছুদিন আগেই অবসর নেয়া কুমার সাঙ্গাকারা কিভাবে ভেবেছেন তাও জানা উচিত। স্টিভ স্মিথের মতো আনকোড়া একজন অলরাউন্ডার কীভাবে নিজেকে পৃথিবীর সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন বানালেন? শুধু কি কৌশলেই নাকি দর্শনে?

ইউনুস খান তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আপনি সবসময় রান পাবেন না। যখন পাবেন তখন রান করেই যেতে হবে। সেই সময়টা গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এটা তার দর্শন।

সময়ের সেরা অন্যতম ফুটবলার রোনালদো একের পর এক সাফল্য পাওয়ার পরেও অনুশীলনে সবার আগে উপস্থিত হন। এটা অনুশীলনের বিষয় যতটা তার চেয়ে এটা তার দর্শন এবং আত্মপোলব্ধির বেশি।
খেলোয়াড়রা যেন শুধু মাঠের অনুশীলনগুলোই না করেন, একই সঙ্গে বড় বড় খেলোয়াড় বা সম্ভাবনাময় যাদের ক্যারিয়ার হয়নি তাদের ধ্যান-ধারণাগুলোও পড়া ও জানার চেষ্টা করেন। তাতে হয়তো নিজেই সমস্যা ও সমাধান বের করতে পারবেন। ক্রিকেটটা শুধুমাত্র হয়তো অনুশীলনের নয়, একই সঙ্গে দর্শন ও পড়াশোনারও।

যারা এই মুহূর্তে দলের বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে নিজের ক্যারিয়ারকে হুমকির মুখে ফেলেছেন তারা কি ভাবছেন? সাকিব-তামিম-মাশরাফিদের এই প্রজন্মকে পেয়েও যদি নিজেদের সফল করতে না পারেন তবে কবে পারবেন? সফলতা পাওয়া বা না পাওয়া একটা বিষয়, কিন্তু চেষ্টা না করা ভিন্ন বিষয়। চেষ্টাটা তখনই উচ্চতায় পৌঁছায় যখন নিজেকে নিজেই অনুপ্রেরণা দেয়া যায়। আর নিজেকে অনুপ্রাণিত করার ভালো একটি উপায় হলো, নিজের দর্শন ও আত্মপোলব্ধিকে উন্নত করা। এটা যেখান থেকে খুঁজে নেয়া যায়। চাইলে চোখের সামনে মাশরাফি থেকেও।

Leave A Reply

Your email address will not be published.