ক্রিকেটারের ফাঁসি

0 43

ডেস্ক: ক্রিকেট জগতে অপরাধ আর অপরাধী নিতান্তই কম নয়। স্পট ফিক্সিং বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ে নিষিদ্ধ হওয়া খেলোয়াড়ের অভাব নেই। কিন্তু যদি বলি, খুনের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলেছেন এক টেস্ট ক্রিকেটার, অনুভূতি কেমন হবে?

১৯৫৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেসার লেসলি হিলটনকে স্ত্রী হত্যার অপরাধে ঝোলানো হয়েছিলো ফাসিতে। ভয়ঙ্কর পেস বোলারদের জন্য ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ বিখ্যাত, কিন্তু তাদের মনে কাউকে খুন করার বাসনা জাগেনি, বরং তারা ক্রিকেট মাঠে উইকেট শিকারে উন্মত্ত থাকতেন। এই জ্যামাইকানই এখন পর্যন্ত একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার, যার মৃত্যু জল্লাদের হাতে। হিলটন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে খেলেছেন ৩০ দশকে। দীর্ঘদিন জ্যামাইকার হয়ে খেলা এই সিমারের টেস্ট অভিষেক হয় ১৯৩৪-৩৫ মৌসুমে, রবার্ট ওয়াইটের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই সিরিজে হিলটন নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট। হিলটনের অভিষেক অদ্ভুত এক ম্যাচে।

বৃষ্টি বেহাল দশার এক পিচে ব্যাট করতে পাঠানো হয় ক্যারিবিয়ানদের, তারা সংগ্রহ করে মোটে ১০২ রান। মার্টিনডেল ও হিলটনের বোলিং তোপে প্রথম দিন শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর ছিলো ৭ উইকেটে ৮১ রান। রাতে আরো বৃষ্টি হলে ওয়াট ডিক্লেয়ার করার সিদ্ধান্ত নেন, তার ইচ্ছে ভয়ঙ্কর এই পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কম রানে আটকে তাড়া করে জেতা। ক্যারিবীয় অধিনায়ক জ্যাকি গ্রান্ট যেন করলেন চোরের উপর বাটপাড়ি, ব্যাটিং অর্ডার উল্টে দিলেন। ওপেন করলেন হিলটন, করলেন ক্যারিয়ার সেরা ১৯। কিন্তু বৃষ্টি আর রোদ মিলিয়ে অবস্থা এতটাই জঘন্য ছিলো যে, দলের সেরা ৩ ব্যাটসম্যান নামার আগেই ৫১ রানে ডিক্লেয়ার করতে বাধ্য হন গ্রান্ট। সবাই ভেবেছিলো, এই পিচে ইংল্যান্ডের এই পক্ষে এই রান তাড়া করে জেতা অসম্ভব। অন্যদিকে, মার্টিনডেল আগুন ঝরিয়ে ৫ উইকেট তুলে নিলেন, কিন্তু পিচের অদ্ভুত আচরণের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি অনভিজ্ঞ হিলটন। তার এই অনভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ওয়ালি হ্যামন্ডরা চার উইকেট হাতে রেখেই পৌছে যান জয়ের বন্দরে।

যদিও পরের দুই টেস্টে অসাধারণ বোলিং করেন হিলটন, ওয়েস্ট ইন্ডিজও দুই টেস্টেই জয় তুলে নিয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেয়। ১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ড সফরে ডাক পান হিলটন, কিন্তু ততদিনে নিজের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছেন। প্রথম দুই ম্যাচ খেলার পর ওভাল টেস্টে বাদ দেয়া হয় তাকে, যেটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তার শেষ ম্যাচ। হিলটন তার টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করেন ৬ ম্যাচে ২৬ দশমিক ১২ গড়ে ১৯ উইকেট নিয়ে। একই বছরে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটও ছেড়ে দেন তিনি, সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন ফোরম্যান হিসেবে।

জ্যামাইকার পুলিশ ইন্সপেক্টরের মেয়ে লার্লিন রোজের প্রেমে পড়েন হিলটন। সম্পর্কের শুরুটা ঠিক আদর্শ ছিলো না, ব্যাপারটা ছিল অনেকখানি সিনেমার ধনী গরীবের প্রেমের মত। লার্লিন যেমন সমাজের উচুস্তরের পরিবারের মেয়ে, হিলটন সেই তুলনায় বেশ নীচেই ছিলেন। রাগে অগ্নিশর্মা লার্লিনের বাবা তো হিলটনের নামে পুলিশ রেকর্ড পর্যন্ত ঘেটেছেন, মামলা খোঁজার জন্য! শেষ পর্যন্ত তাতে লাভ হয়নি, জয় হয় ভালোবাসার। ১৯৪২ সালের শেষদিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন দুজন, বছর পাঁচেক পর তাদের ঘর আলো করে আসে পুত্র সন্তান।

ঝামেলা বাঁধলো বিয়ের এক যুগ পর, ১৯৫৪ সালে। নিজের তৈরি পোশাকের ব্যবসার জন্য ঘনঘন নিউইয়র্ক যাওয়া শুরু করেন লার্লিন। সে বছর এপ্রিলেই এক উড়ো চিঠি থেকে হিলটন জানতে পারেন, ব্রুকলিন এলাকার প্লেবয় হিসেবে খ্যাত জনৈক রয় ফ্রান্সিসের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত লার্লিন। ক্ষুদ্ধ হিলটন সঙ্গে সঙ্গে লার্লিনকে ফিরে আসার জন্য টেলিগ্রাম করেন। উড়ো চিঠিতে পাওয়া কোনো তথ্যই লার্লিনের কাছে লুকোননি হিলটন, বরং সেগুলো দেখিয়েছিলেন তার শ্বাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের। ততদিনে অবশ্য ওপাড়ে পাড়ি জমিয়েছেন লার্লিনের ইন্সপেক্টর পিতা। ফিরে এসে লার্লিন তার অবৈধ সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন, ফ্রান্সিসকে পরিচয় দেন স্রেফ একজন পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে।

লার্লিনের ফিরে আসার আগের দিন ব্যক্তিগত রিভলভারের জন্য বেশ কিছু গুলি কেনেন হিলটন। পরে জানিয়েছিলেন, ওই সময়ে বাড়িরর আশপাশের এলাকায় চুরি-ডাকাতি এবং অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায়, পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি অতিরিক্ত গুলি কেনেন।

যাইহোক, তখনকার মত বিষয়টার সমাধান হয়। এরমধ্যে একদিন হিলটন জানতে পারেন বাড়ির পরিচালিকাকে একটি চিঠি দিয়ে স্থানীয় ডাকঘরে পাঠিয়েছেন লার্লিন। রয়কে লেখা চিঠি ভেবে, ছুটলেন হিলটন। এই চিঠি তাকে পড়তেই হবে। কিন্তু পৌছাতে দেরি হলো, পরিচালিকা ততক্ষণে সেটি পোস্ট করে দিয়েছেন। ডাকঘরে অনেক অনুরোধ করেও চিঠিটি হাতে পেলেন না হিলটন। হতাশা পরিণত হলো রাগে। কারণ ততক্ষণে হিলটন তার স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্কে সুনিশ্চিত।

এরপরের ঘটনা সঠিক জানার কোনো উপায় আর নেই। তবে আদালতে নিজ বয়ানে হিলটন বলেন, বাড়ি ফিরে সরাসরি স্ত্রীকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। এবং লার্লিন সত্য স্বীকার করে নেয়। সে সময়ে লার্লিন বলেন, তোমার সঙ্গে জড়িয়ে নিজের জীবন নষ্ট করেছি। আর এখন যেহেতু সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েছি, তুমি কোনোভাবেই বাঁধা হতে পারবে না। সে এমন আনন্দ, তৃপ্তি দিয়েছে যা তোমার সঙ্গে কখনো পাইনি। হ্যা, তার সন্তান গর্ভে ধারণ করতে চাই। হ্যা, তার সঙ্গে বিছানায় গেছি এবং সেই অনুভব ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার এই শরীর শুধু তার জন্য। আমি শুধু রয়ের, রয়ের, রয়ের…।

বয়ান অনুযায়ী এরপরই নাকি লার্লিন বেডরুমে থাকা রিভলবার এনে হিলটনকে গুলি করেন। কিন্তু গুলি বের হয়নি। আর তারপর কী ঘটে সেটা সম্পর্কে হিলটনও পরিস্কার কিছু বলতে পারেননি। তিনি বলেন, হঠাৎই দেখলাম রক্ত আর রক্স। সেখানেই পড়ে আছে লার্লিন। হিলটনই পুলিশে ফোন করেন। আদালতে হিলটন বলেন, আত্মরক্ষার জন্যই তিনি লার্লিনকে গুলি করেন। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, তার স্ত্রীর শরীরে প্রবেশ মাত্র একটি বুলেট করেনি, করেছিলো সাতটি। তাছাড়া, হিলটন চাইলে হাসপাতালে ফোন করতে পারতেন কিন্তু করেননি।

হিলটনের পক্ষে লড়েন জ্যামাইকার নামকরা দুই আইনজীবী ভিভিয়ান ব্লেক ও নোয়েল নেথারসোল। নোয়েল আবার ছিলেন হিলটনের জ্যামাইকা দলের অধিনায়ক। কিন্তু তারপরও ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবরে জুরি তাদের রায় প্রদান করে, যেখানে তারা নিঃসন্দেহে হিলটনকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং ফাঁসির আদেশ দেন।

রেকর্ডবুকে নাম তোলার আশা কোন ক্রিকেটারের থাকে না বলুন? কিন্তু এভাবে বোধহয় নয়। রেকর্ড বুকের ওই পাতায় তাই একটাই নাম: লেসলি হিলটন– ফাঁসিতে ঝোলা একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!

Leave A Reply

Your email address will not be published.