ফের আওয়ামী লীগ সরকারের যাত্রা শুরু

প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার রেকর্ড

0 39

 

ডেস্ক: নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে।

সোমবার বিকেলে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।

এদিকে নতুন সরকারের দায়িত্ব পরিচালনায় চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ নিয়ে টানা তৃতীয় এবং সবমিলিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। এরইমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা থাকার রেকর্ডও গড়েছেন শেখ হাসিনা।

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৪৭ জন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের রেকর্ড গড়ার পর চমক লাগানো মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা শপথ নিলেন। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শপথ নেয়ার পর ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী শেষে ৩ জন উপ-মন্ত্রীর শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। নতুন মন্ত্রিসভায় আছেন ৩৫ জেলার প্রতিনিধি। বাকি ২৯ জেলার কেউ এখন পর্যন্ত স্থান পাননি। আওয়ামী লীগ সরকারে এলে সব সময় মন্ত্রী থাকে, এমন বেশ কিছু জেলাও বঞ্চিত হয়েছে এবার। এবারের ৪৭ জনের মন্ত্রিসভায় ২৭ জনই নতুন মুখ। পুরোনোদের মধ্যে ৩৬ জন বাদ পড়েছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন এই মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে দেশের নতুন সরকার গঠন হলো। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার পর আগের মন্ত্রিসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে গেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা নিজ নিজ দফতরে অফিস করবেন।

মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা শপথ নিতে বঙ্গভবনে আসতে শুরু করেন বেলা ৩টার আগেই। তারা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। সঙ্গে আসেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের পরিবার সদস্য ও স্বজনরা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, বঙ্গবন্ধু পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান আওয়ামী লীগের এমপি, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আরো ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিচারপতি, শিক্ষক, কূটনীতিকসহ এক হাজারের মতো অতিথি।

প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শপথ নেয়ার পর ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরী দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুকে জড়িয়ে নেন, গালে চুমু খান। পরে হাত নেড়ে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসন গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানা ছাড়াও তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক স্ত্রী পেপপিকে নিয়ে এসেছিলেন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে।

প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন ও শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলও শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সিইসি কে এম নূরুল হুদা নতুন সরকারের অভিষেকে উপস্থিত ছিলেন। একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বা তার স্ত্রী গত সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদকে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আসেনি।

জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহি বি চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম উপস্থিত ছিলেন দরবার হলে। নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ, এ এইচ মাহমুদ আলী, কামরুল ইসলাম, শামসুর রহমান শরীফ শপথ অনুষ্ঠানে ছিলেন। গত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা এইচ টি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও গওহর রিজভীও ছিলেন বঙ্গভবনে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২৫৬টিতেই জয় পায় আওয়ামী লীগ। মহাজোট পায় ২৮৮টি। যার মধ্যে জাতীয় পার্টি ২২টি, জাসদ তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি, বিকল্পধারা দুটি, তরিকত ফেডারেশন একটি ও বাংলাদেশ জাসদের একটি আসন রয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র সাতটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন তিনটি আসনে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এমপিরা ছাড়া নবনির্বাচিত সব এমপিই শপথ নেন। বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা সংসদ নেতা নির্বাচিত হন। পরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান।

চমক লাগানো মন্ত্রিসভার সদস্যরা হলেন:

চমক লাগানো মন্ত্রীপরিষদের ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে যারা শপথ নিলেন তারা হলেন- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রণালয়ে মো. আব্দুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, তথ্য মন্ত্রণালয়ে ড. হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ কে আব্দুল মোমেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এম এ মান্নান, শিল্প মন্ত্রণালয়ে নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জাহিদ মালেক, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে মো. শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমি মন্ত্রণালয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রলণালয়ে মো. নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে স্থপতি ইয়াফেস ওসমান (টেকনোক্র্যাট), ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মোস্তাফা জব্বারকে (টেকনোক্র্যাট) রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ান। পরে ১৯ জন প্রতিমন্ত্রীকে প্রেসিডেন্ট শপথ পড়ান। এরা হলেন- কামাল আহমেদ মজুমদার (শিল্প), ইমরান আহমেদ (প্রবাসীকল্যাণ), জাহিদ আহসান রাসেল (যুব ও ক্রীড়া), নসরুল হামিদ (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি), আশরাফ আলী খান খসরু (মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ), মন্নুজান সুফিয়ান (শ্রম), খালিদ মাহমুদ চৌধুরী (নৌপরিবহন), জাকির হোসেন (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা), শাহরিয়ার আলম (পররাষ্ট্র), জুনাইদ আহমেদ পলক (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি), ফরহাদ হোসেন (জনপ্রশাসন), স্বপন ভট্টাচার্য (স্থানীয় সরকার), জাহিদ ফারুক (পানিসম্পদ), মো. মুরাদ হাসান (স্বাস্থ্য), শরীফ আহমেদ (সমাজকল্যাণ), কে এম খালিদ (সংস্কৃতি), এনামুর রহমান (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ), মাহবুব আলী (বিমান), শেখ মো. আবদুল্লাহ (টকনোক্র্যাট) (ধর্ম)। সবশেষে তিন উপমন্ত্রীকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। উপমন্ত্রীরা হলেন, হাবিবুন নাহার (পরিবেশ), এ কে এম এনামুল হক শামীম (পানিসম্পদ), মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল (শিক্ষা)।

শেখ হাসিনার যত রেকর্ড:

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে আরো একটি রেকর্ড গড়লেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এরইমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা থাকার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এই শপথ নেয়ার মধ্য দিয়ে সর্বশেষ রেকর্ডটি গড়েন তিনি। তাছাড়া টানা প্রায় ৩৮ বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। চারবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে আর নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথম বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৪, ২০১৪ থেকে ২০১৯ মেয়াদে দুই বারে ১০ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গতকাল চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। বাংলাদেশে পরপর তিন বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নজিরও আর কারো নেই।

বিরোধীদলীয় নেতা

বাংলাদেশের তিনটি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে, ১৯৯১ সালে পঞ্চম এবং ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। সে সময় শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহনা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। এরপর ৬ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালে ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবেই দেশে ফেরেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.