দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে সরকার

0 35

 

ডেস্ক: টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে নতুন মন্ত্রিসভায় চমক দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা দেন তিনি। ফলে দায়িত্ব পাওয়ার পর আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন মন্ত্রীরাও। আর এতে সচিবালয়, বিভিন্ন বিভাগ এমনকি অধিদফতরের দুর্নীতিবাজরা রয়েছেন চরম আতঙ্কে।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এরইমধ্যে শুরু হয়েছে অ্যাকশন। দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করতে চলছে মিশন। নতুনভাবে সরকার গঠনের পর কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনকে গেল ১৩ জানুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপ-সচিব শাহিনা খাতুন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আবজালের নামে রাজধানীর উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নম্বর ৪৭, ৬২ ও ৬৬। এছাড়া ১৬ নম্বর রোডেও রয়েছে আরো একটি পাঁচতলা বাড়ি।

গত ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে অভিযান চালিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের অফিসের আলমারি থেকে ৬ লাখ টাকা জব্দ করেন দুদক কর্মকর্তা। টাকার উৎস জানতে চাইলে, কোনো ঠিক জবাব দিতে পারেননি নাজিম। পরে তাকে আটক করা হয়। ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে নাজিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার ও মন্ত্রিসভার জিরো টলারেন্সের অ্যাকশন শুরু হয়েছে। আরো বেশ কয়েকটি অভিযোগ আছে দুদকের কাছে। দুদক সূত্র জানায়, শিগগিরই জমে থাকা অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে এসে পৌঁছালে মাঠে নামবে তারা। তাদের হাতে-নাতে ধরার পরিকল্পনা ও রয়েছে দুদকের।

এদিকে, সচিবালয় ও দুদকের আরেকটি সূত্র জানায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়ায় ফেঁসে যেতে পারেন অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। সূত্রটি আরো জানায়, একশ’ দিনের কর্মসূচির আওতায় মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ও অধিদফতরের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সর্তকও করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, এরই মাঝে খুঁজে বের করা হচ্ছে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের। করা হচ্ছে তালিকা। তারপরই শুরু হবে মূল অ্যাকশন।

এমন পরিস্থিতিতে ‘দুর্নীতিকে ছাড় নয়’- মন্ত্রীদের এমন ঘোষণায় বদলি আতঙ্ক পেয়ে বসেছে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের। ৮ জানুয়ারি মন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার কার্যালয়ে বসেই দুর্নীতিবাজ কর্মীদের ‘ভালো হওয়ার’ বার্তা দেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যাদের সমস্যা তাদেরকে বলব ভালো হয়ে যেতে, আর না হয় অন্য জায়গায় চলে যেতে।

সচিবালয়ের অফিস কক্ষে প্রথম কর্মদিবসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে আগামী পাঁচ বছর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে থাকবে চমক। তাই মন্ত্রণালয়ে কোনো ধরনের দুর্নীতি প্রশ্রয় দেয়া হবে না। একদমই দেয়া হবে না ছাড়।

শপথ নেয়ার পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, প্রথম এমপি হয়েই মন্ত্রী হয়েছি। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছি। সফল হওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস ও যোগ্যতা আমার আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি সবসময় সোচ্চার। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির কথা।

রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতি নির্মূলের ঘোষণা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া দুর্নীতিবিরোধী প্রতিটি ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। সে অনুযায়ী রেলকেও করা হবে দুর্নীতিমুক্ত। রেলসেবাকে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া হবে। এর সঙ্গে উন্নয়ন কাজও চলবে।

দায়িত্ব পাওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ক্রীড়াঙ্গনে কেউ দুর্নীতি করলে, তাকে ছাড় দেয়া হবে না। সততা বড় একটি বিষয়, যে কারণে আজ আমি এখানে আসতে পেরেছি। এটা আমার বাবারও ছিল। আমিও সততাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

ফলে সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণে নতুনভাবে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিভিন্ন মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার অবস্থানে রয়েছেন। এর সঙ্গে আবার আরেকটি ইস্যু মাদক নির্মূলেও অনড় অবস্থানে রয়েছে সরকার।

এদিকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের এমন হুঙ্কারে অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আতঙ্কে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের জোরালো অবস্থানের ফলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন। দুর্নীতির ফলে বদলি আতঙ্ক ছাড়াও চাকরি হারানোর চিন্তাও পেয়ে বসেছে অনেকের।

তিনি আরো বলেন, হয়তো অনেক দুর্নীতিবাজ সর্তক হবেন। বন্ধ হতে পারে দুর্নীতি। মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সচেষ্ট থাকলে দুর্নীতির মাত্রা অনেকাংশে কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।

নতুন মন্ত্রীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে- প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায়, সর্তক তারাও। অন্যদিকে কারোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তকমা লেগে গেলে, মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নতুনরা কতদিন মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন, তা নির্ভর করবে কর্মদক্ষতার ওপর। কেউ পারফরম্যান্স না করে মন্ত্রিত্বে থাকতে পারবেন না।

এদিকে, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের হুশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশনাও দেন।

সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেটা প্রয়োজন, সেটা তো আমরা মিটাচ্ছি। তাহলে দুর্নীতি কেন হবে। মন-মানসিকতাটা পরিবর্তন করতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আপনাদের দিতে হবে, একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত।

এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেবেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.