পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে অপরাধে অবৈধ বিদেশিরা

0 28

 

ডেস্ক: বাংলাদেশের অতিথিপরায়ণতা সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। এরমধ্যে এ দেশে বইছে উন্নয়নের জোয়ার। তাই অন্ন যোগাতে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে চাকরি, ব্যবসা বা শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসছে বিদেশিরা। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অনেকেই অবৈধভাবে থেকে যাচ্ছেন এ দেশে।

এসব অবৈধ বিদেশি নাগরীকরা বেশিরভাগই এটিএম কার্ড জালিয়াতি, মাদক ব্যবসা ও জাল মুদ্রার ব্যবসাসহ করে যাচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশে অবস্থানকারী এ রকম ১৫ হাজার বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। এসব বিদেশি নাগরিক অপরাধীদের নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে বিপাকে।

ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেই বিদেশি এসব অপরাধীরা নিজেদের পাসপোর্টটি ছিঁড়ে ফেলে দেয়। আটক বা গ্রেফতার হওয়ার পর ইংরেজি জানা থাকলেও নিজেদের স্থানীয় ভাষায় কথা বলে সৃষ্টি করে বিভ্রান্তির। তাই সে কোন দেশের নাগরিক তা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হয়রানি হতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশি-বিদেশিদের সমন্বয়ে গড়া এসব অপরাধী চক্রকে পরিচালনা করা হয় বিদেশের মাটিতে বসে। মূল শিকড় বিদেশে থাকায় প্রধান হোতারা থেকে যায় আন্তরালে। এভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ১৫ হাজারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থান করা ১০৯টি দেশের এসব নাগরিকের মধ্যে ১৪টি দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এসব বিদেশি অপরোধীদের তালিকার শীর্ষে রযেছে নাইজেরিয়ার নাগরিকরা। এরপর রয়েছে ঘানা, সুদান, কঙ্গো, আলজেরিয়া, লিবিয়া ও উগান্ডা। সারা দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি আছে ৭ শ’র বেশি বিদেশি নাগরিক। এদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত রয়েছেন ৭৯ বিদেশি নাগরিক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই গত বছরের (২০১৮) জুলাই মাস পর্যন্ত আর্থিক প্রতারণার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে ২৬ বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ২০ জনই আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার নাগরিক। বাকি ৬ বিদেশির মধ্যে তিনজন ক্যামেরুনের নাগরিক। কঙ্গো, পোল্যান্ড ও চীনের নাগরিক রয়েছেন একজন করে। তারা সবাই অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছিলেন।

অন্যদিকে কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মাদক চোরাচালান, প্রতারণা ও জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শতাধিক বিদেশি নাগরিক কারাগারে বন্দি রয়েছে। এদের মধ্যে সাজার মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত দুই বছর জেলে আছেন ৮০ জন।

গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটি’র বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে বিশ্বের অনেক অনুন্নত দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশ একটি অকর্ষণীয় দেশ। বিশেষ করে আফ্রিকান অনেক দেশ থেকে এখন বিদেশিরা এদেশে আসছেন। তবে এদের একটি অংশ আসে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। তারা প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনী আটকের পর তারা ইংরেজি ভাষা জানলেও স্থানীয় ভাষায় কথা বলে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা ছিঁড়ে ফেলে দেয় তাদের পাসপোর্ট। ফলে বোঝা যায় না তারা কোন দেশের নাগরিক। কোন এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশে এসেছে তাও শনাক্ত করা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরে এ দেশীয় সহযোগীরা তাদের জামিনে বের করিয়ে নেয়। জেল থেকে বের হয়েই তারা আবারো শুরু করে অবৈধ কাজ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত বছর পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) রাজধানীতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরীকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। এসবি’র ২৯টি টিম রাজধানীর বসুন্ধরা, বারিধারা, গুলশান, বনানী, নিকুঞ্জ, পিংক সিটি, লেকসিটি কনকর্ড, উত্তরা ও মতিঝিলসহ ১৯টি এলাকায় অবস্থানকারী এক হাজার বিদেশির তথ্য সংগ্রহ করে। ওই অভিযানে দেখা যায়, প্রায় ১০ হাজার বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আর এসব বিদেশি নাগরীকদের মধ্যে প্রায় ৪’শ জনই অবৈধভাবে অবস্থান করছেন এ দেশে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি বা বেপজা, নন-গর্ভমেন্ট অর্গানাইজেশন (এনজিও), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন বিভাগের মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পায়। এরমধ্যে শিল্প ও সেবা খাত সংশ্লিষ্টরা আসে বিনিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে। স্বরাষ্ট্র ও ইমিগ্রেশন বিভাগের মাধ্যমে আসে ট্যুরিস্ট, ওয়ার্কপারমিট লাভকারী ও স্টুডেন্ট ভিসায় আসা নাগরিকরা। বেপজা ও এনজিও ব্যুরো নিয়ন্ত্রিত হয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মাধ্যমে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের বিষয়ে কাজ করে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একাধিক ডেস্ক। তবে এসব ডেস্কের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে প্রকট। আর এই সমন্বয়হীনতার কারণেই যথাযথভাবে বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। সম্প্রতি এক সংবাদ সন্মেলনে ঢাকা মহানগরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, নাইজেরিয়া, ঘানাসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশিদের অতিথিপরায়নতার সুযোগ নিয়ে এ দেশে আসে। পরে বিভিন্ন প্রকার প্রতারণামূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে তারা। প্রতারক এসব বিদেশিদের অনেকেরই পাসপোর্ট থাকে না। আবার কারো পাসপোর্ট থাকলেও তাতে ঠিকানা থাকে ভুয়া। তাই তাদের আদালতে হাজির করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এসব বিদেশি নাগরিক পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.