বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে মিয়ানমারের প্রতারণা

0 85

 

ডেস্ক :বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ছবি নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিহত বাংলাদেশিদের লাশের একটি ছবিকে মিয়ানমার তাদের একটি বইয়ে ‘বাঙালি (রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার বাঙালি বলে দাবি করে) কর্তৃক স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। স্থানীয় নৃগোষ্ঠী বলতে মিয়ানমার রাখাইন বৌদ্ধদের বুঝিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের ওপর সাদা-কালো ছবির সংকলনের নতুন একটি বই প্রকাশ করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বইয়ে ছবির শিরোনামগুলোও লিখেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

ওই বইয়ের সাদা-কালো একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন লোক জমিতে দেওয়ার মই নিয়ে নদীতে ভাসমান দুটি লাশের পাশে তীরে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটির শিরোনামে লেখা, ‘বাঙালি কর্তৃক নৃশংসভাবে স্থানীয় নৃগোষ্ঠী হত্যা’। প্রকৃতপক্ষে এ ছবিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি হত্যার পর ছবিটি তোলা হয়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রকাশিত ওই বইয়ে ১৯৪০ সালে মিয়ানমারে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ওপর একটি অধ্যায়ে এই ছবিটি স্থান পায়। ওই অধ্যায়ে বলা হয়, ‘ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাঙালি কর্তৃক বৌদ্ধরা হত্যার শিকার হয়।’ বইতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী বুঝাতে তাদের ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

তবে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে ছবিটির সত্যতা উঠে আসে। রয়টার্স জানায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে যখন লাখো বাংলাদেশি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয় সে সময়ের একটি ছবি এটি।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণসংযোগ ও মানসিক যুদ্ধাবস্থা বিষয়ক বিভাগ ওই বইটি প্রকাশ করে। বইতে মোট তিনটি ছবি রয়েছে। ছবিগুলোকে রাখাইন রাজ্যের ছবির আর্কাইভ হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

রয়টার্স তাদের অনুসন্ধান শেষে জানায়, বইয়ে ব্যবহৃত তিনটি ছবির একটি বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় তোলা ছবি। দ্বিতীয় ছবিটি ২০১৫ সালে ইয়াঙ্গনে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জব্দ করা একটি নৌকায় দেশান্তরের চেষ্টায় থাকা রোহিঙ্গাদের। তৃতীয় ছবিতে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ তাঞ্জানিয়ায় তোলা। এসব ছবিকে রাখাইনে বৌদ্ধ নিপীড়নের ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ইয়াঙ্গনে মিয়ানমারের নৌবাহিনী দেশান্তরের চেষ্টায় থাকা রোহিঙ্গাদের একটি নৌকা জব্দ করেছে। মূলত মিয়ানমারের নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে যেতে গিয়ে ধরা পড়ার পর ওই ছবি তোলা হয়। ছবিটি উল্টো করে সাদা-কালোতে বদলে নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বইয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে বাঙালিদের মিয়ানমারে অনুপ্রবেশের ছবি।

তৃতীয় ছবিতে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে প্রবেশ করছে। সেই ছবিটিও প্রতারণামূলক। ছবিটি মূলত রুয়ান্ডার হুতু সম্প্রদায়ের যারা রুয়ান্ডা থেকে পালিয়ে তাঞ্জানিয়া যেতে চেয়ে সেই দেশের সেনাবাহিনীর বাধা পেয়ে কেনিয়া বা মালাবি হয়ে ফের রুয়ান্ডা ফেরত যাচ্ছে। অথচ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বইয়ে ছবিটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশকালে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রবেশে হিসেবে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হতে কিংবা দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ইউ মিও মিন্ট মং বইটি পড়েননি দাবি করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

মিয়ানমার পলিটিক্স অ্যান্ড দি তাতমাদো : পার্ট ১’ নামের ১১৭ পাতার বইটি গত জুলাই মাসে প্রকাশ করা হয়। ‘তাতমাদো’ হলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নাম। বইটিতে গত বছরের আগস্টের ঘটনায় সেনাবাহিনীর বর্ণনা সংযোজন করা হয়। সেই সময়েই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, গণহত্যা, গণধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনের মুখে নতুন করে ৭ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় করে।

বইয়ের অধিকাংশ তথ্যে রেফারেন্স হিসেবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘ট্রু নিউজ’ নামের তথ্য ইউনিটের কথা বলা হয়েছে। এই ইউনিটই গত আগস্ট নতুন করে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পর থেকে সেনাবানিহীর দৃষ্টিভঙ্গি কেন্দ্রীক খবর প্রকাশ শুরু করে। তারা মূলত ফেসবুকের মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়ায়।

মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গনের বইয়ের দোকানগুলোতে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। ইনওয়া নামের ইয়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানের এক কর্মচারী জানান, দোকানের অর্ডারকৃত ৫০ কপি বই বিক্রি হয়ে গেছে। তবে তারা আর বইটির জন্য অর্ডার দেবেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বইবিক্রেতা বলেন, ‘বইটির ব্যাপারে মানুষের তেমন একটা আগ্রহ নেই।’

গত সোমবার নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও আরো কয়েকজন সেনাসদস্যকে নিষিদ্ধ করেছে ফেসবুক। একইদিন জাতিসংঘের তদন্তকারী দল অভিযোগ করে বলেছে, সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গণহত্যা’ উপেক্ষা করার ক্যাম্পেইন চালিয়েছেন। মিন অং হ্লাইং ও আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ শাস্তির সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ তদন্তকারী দলটি।

নতুন বইয়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। তারা বরং ‘বাঙালি সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ এনেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.