পর্যাপ্ত মজুদের দাবি সরকারের, তবুও দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা

0 644

চাহিদার তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অনেক বেশি মজুদ থাকায় আসন্ন রমজানে পণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে এমনটাই দাবি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কোনো পণ্যের সঙ্কট বা সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না বলেও জানানো হয়। তারপরও অতীতের অভিজ্ঞা থেকে রোজায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি, মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক সভা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

সভায় তিনি বলেন, চিনি ও পেঁয়াজ ছাড়া সব ধরনের পণ্যের বাজারদর স্বাভাবিক রয়েছে। রামজানে মাসে প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ চাহিদোর চেয়ে কায়েকগুণ বেশি রয়েছে। তবে কোনো ব্যবসায়ী যদি পণ্য মজুদ করে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে ব্যবসায়ীদের সহনীয় পর্যায়ে লাভ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সভায় ব্যাবসায়ীরা তাদের কাছে মজুদ থাকা বিভিন্ন পণ্যের খতিয়ান এবং পাইকারি ও খুচরা দাম তুলে ধরেন। সাধারণত রোজার মাসে যেসব পণ্যের বেশি চাহিদা থেকে সেগুলোর সঙ্কট হবে না বলেও মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন তারা। তবে প্রতিবছর রোজাকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের দেখা যায় না। রোজা আসলেই তারা দাম বাড়িয়ে দেয়।

তাই এবারও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রমজান শুরু হওয়ার আগেই ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, ছোলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই রাজধানীর বাজারগুলোতে চিনি, মুরগি, পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শুভাশীষ বসু জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজান উপলক্ষ্যে অন্যান্য বারের মতো এবারও আমাদের মজুদ পরিস্থিতি খুব ভালো। রমজানে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে সেগুলোর মজুদ বাড়ানো হয়েছে। কোনো রকম সঙ্কটের আশঙ্কা নেই।’

তিনি আরও বলেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিভিন্ন টিম বাজারে বাজারে গিয়ে অভিযান চালায়। রোজায় এ অভিযানের পরিমাণ আরও বাড়বে। তাছাড়া এবার কোনো ধরনের কারসাজির সুযোগ নেই। কারণ যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আনতে হয় সেসব পণ্য এবার বেশি বেশি আমদানি করে মজুদ রাখা হয়েছে। কেউ কারসাজি করলে তার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রমজানে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভোক্তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান।

তিনি বলেন, রোজা আসলেই কিছু পণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। তবে এর জন্য শুধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করলে হবে না। আমাদের ভোক্তাদেরও মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। রোজার শুরুতে এক সঙ্গে ১৫ দিনের পণ্য ক্রয়ের যে মানসিকতা তাতে পরিবর্তন আনা জরুরি। কারণ প্রতিদিন পণ্য কিনলে বাজারে চাপ পড়ে না। আর একসঙ্গে কিনলে বাজারে সংশ্লিষ্ট পণ্যের সাময়িক সংকট দেখা দেয়, যা থেকে ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিয়ে থাকে। আর ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের যেসব সংস্থা বাজার মনিটরিং করে সেসব মনিটরিং টিম আরও কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

গত রোববার (১৩ মে) মন্ত্রণালয় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ভোক্তাদের জন্য এ সুখবর দিয়ে আরও বলা হয়, রমজানের চাহিদাকে পুঁজি করে কেউ যাতে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে সে লক্ষ্যে বাজারের দিকে গোয়েন্দা সংস্থার তীক্ষ্ণ নজরদারি থাকবে। ওই প্রতিবেদনে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ও যোগান বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোজ্যতেল : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ১০ হাজার টন সয়াবিন ও পাম অয়েলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজান মাসে চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ টন। এর মধ্যে দেশে প্রায় ৭ লাখ টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। ঘাটতি পূরণে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের প্রথম নয় মাসে ১৮ লাখ ৮৩ টন ভোজ্যতেল আমদানি করেছে। সুতরাং এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ভোজ্যতেল মজুদ রয়েছে।

পেঁয়াজ : দেশে প্রায় ২২ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন চাহিদা থাকলেও রোজার মাসে চাহিদা দাঁড়ায় ৩ লাখ টন। এর মধ্যে ২১ লাখ ৫৩ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন হয়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৫ লাখ ১৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা যথেষ্ট স্বাভাবিক ও দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

ডাল : দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ডালের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে। রমজান মাসে চাহিদা দাঁড়ায় ৬০ টন। এর মধ্যে দেশে ১০ লাখ টন সব ধরনের ডালের উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৮ লাখ ৯৭ হাজার ২৯৫ টন ডাল (মশুর ও মুগ ডাল) আমদানি করেছে। সুতরাং এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ডালের মজুদ রয়েছে।

ছোলা : অভ্যন্তরীণ মার্কেটে বার্ষিক ছোলার চাহিদা রয়েছে ১ লাখ টন। রমজান মাসে চাহিদা দাঁড়ায় ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে ৭ হাজার টন দেশে উৎপাদিত হয়ে থাকে। বাকিটা আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। এনবিআরের তথ্যমতে, ঘাটতি পূরণে ব্যবসায়ীরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ২ লাখ ৩৩ হাজার ছোলা আমদানি করেছে। সুতরাং এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছোলার মজুদ রয়েছে।

চিনি : দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন চিনির বার্ষিক চাহিদা রয়েছে। রোজার মাসে ৩ লাখ টন চাহিদা দাঁড়ায়। এর মধ্যে দেশে প্রায় ৬৮ হাজার ৫৬২ টন চিনির উৎপাদন হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চিনি আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

এনবিআরের তথ্যমতে, ঘাটতি পূরণে ব্যবসায়ীরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ২০ লাখ ৪৩ হাজার ২৭৯ টন ভোজ্যতেল আমদানি করেছে। সুতরাং এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি চিনির মজুদ রয়েছে।

খেজুর : দেশে বার্ষিক প্রায় ২০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার টন। এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম নয় মাসে ৫৯ হাজার ৪৮১ টন খেজুর দেশে আমদানি হয়েছে। সুতরাং এই মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুনেরও বেশি ছোলার মজুদ রয়েছে। এর ফলে খেজুরের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। তাই রমজানেও খেজুরের দাম বাড়বে না বলে দাবি করা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।

এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- চাল, গম, আদা রসুনের মজুদ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি মজুদ রয়েছে। ফলে এসব পণ্যের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। তাই রমজানেও দাম বাড়বে না বলে দাবি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.