এবার বাগদাদের গ্রিন জোনে রকেট হামলা

কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত বাগদাদের কূটনৈতিক এলাকা গ্রিন জোনে রকেট হামলা হয়েছে। মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার রেশ কাটেনি এখনও। চলছে উভয় দেশের মধ্যে বাকযুদ্ধ। 

চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটলো। যেখানে মার্কিন দূতাবাসসহ সব বিদেশি দূতাবাস অবস্থিত।

দু’টি বিস্ফোরণের শব্দে প্রকিম্পিত হয় বাগদাদ। সাথে সাথে ওই এলাকায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। বুধবার মধ্যরাতের দিকে মার্কিন দূতাবাসের কাছে গ্রিন জোনে ওই হামলা হয় বলে জানায় বার্তাসংস্থা এএফপি। তবে এতে কেউ হতাহত হয়েছে কি না তা জানায়নি সূত্রটি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, এই হামলাটি প্রো-ইরান কোনও মিলিশিয়া বাহিনীর কাজ হতে পারে। তবে এখনও কেউ এই হামলার কথা স্বীকার করেনি।

এদিকে, ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় হামলার ঘটনায় মনে হচ্ছে, ইরান তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসছে। ইরানের হামলায় কোনও সৈন্য হতাহত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, ওই হামলায় ৮০ জন মার্কিন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আল-আসাদ ও ইরবিলে অবস্থিত দু’টি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

ইরানের পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, আমি যতদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকব, ততদিন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেব না। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা বাদ দিয়ে ‘সন্ত্রাস’র পথ ত্যাগ করলে তাদের সাথে শান্তি স্থাপনও সম্ভব। তবে তারা শান্তির পথে না আসলে তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে হুমকি দেন তিনি।

ট্রাম্প বলেছেন, বিমানঘাঁটিতে হামলায় কোনও সৈন্য মারা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতিও সামান্য। ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণের কাজ চলছে। হামলার ঘটনায় প্রতিশোধমূলক হামলার ব্যাপারে কিছু বলেননি তিনি। তবে ইরান নতুন করে হামলা করার সম্ভাবনা নাকচ করায় তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ইরানের যে বোধোদয় হয়েছে, তা সব পক্ষের জন্যই ভালো।

এ সময় ইরানের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ইরানের একটি মহান দেশ হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। আমাদের উচিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ইরানের সাথে নতুন চুক্তিতে যাওয়া।

তবে ইরাকি সংসদে পাস হওয়া মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের বিলের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে ইরানের সেনা কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যায় যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, সে ছিলো একজন ‘সন্ত্রাসী’, তার হাত সাত হাজার ইরানি ও মার্কিনি রক্তে রঞ্জিত ছিল।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার রাতে ইরাকে অবস্থিত দু’টি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভি জানিয়েছে।

এদিকে ইরাকের দু’টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাব দিলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও ইসরাইলে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। এছাড়া লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, যদি ইরানের হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায়, তবে তারা ইসরাইলে হামলা করবে।

তারও আগে আরেক বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, পাল্টা হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে হামলার হুমকি দিয়েছিল ইরান। মঙ্গলবার রাতে ওই দুই ঘাঁটিতে হামলার পর পরই এই হুমকি দেয় ইরান। বুধবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক সংবাদে এ কথা বলা হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রেস টেলিভিশন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বরাতে জানিয়েছে, ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার কথা স্বীকার করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, যদি যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালায় তাহলে তার কঠোর জবাব দেয়া হবে। যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং তা হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে, অন্তত দু’টি বিমানঘাঁটির সেনা আবাসস্থলে এক ডজনেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। অন্তত দু’টি বেইজে আক্রমণ করা হয়েছে। যার একটি ইরবিল এবং অন্যটি আল-আসাদে অবস্থিত। খবর বিবিসি।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় যে হামলা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। তিনি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা দলের সাথে পরামর্শ করছেন।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তাসংস্থা ইরনার বরাতে জানিয়েছে, শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।

“আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সকল সহযোগীদের সতর্ক করেছি, যারা এই সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীকে তাদের বেইজ ব্যবহার করতে দিয়েছে। যেসব জায়গা থেকে ইরানকে লক্ষবস্তু করে হামলা হবে, সেখানেই আক্রমণ করা হবে।”

স্থানীয় আল মায়াদ্বীন টেলিভিশনের এক খবরে বলা হয়েছে, কাসেম সোলেইমানিকে নিজ শহরে দাফনের কয়েক ঘন্টা আগেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম হামলাটি হয়েছে আলা-আসাদে এবং দ্বিতীয়টি ইরবিলের বিমানঘাঁটিতে।

ঘটনার দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার দেশটির জন্য একটি খারাপ বিষয় হবে।

তার এই মন্তব্য এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন সেনাবাহিনী ইরাক থেকে সৈন্য সরানোর ব্যাপারে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিল, এর পরপরই আবার সেটি ভুলবশত পাঠানো হয়েছে বলে বিবৃতি দেয়। ওই চিঠিতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে মার্কিন সৈন্য সরানোর কথা বলা হয়েছে।

মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর বক্তব্য দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদিরা আমাদের প্রধান শত্রু। তারা আমাদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করতে কাজ করছে।”

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ এই হামলার পর বলেছেন, তারা যুদ্ধ অথবা উত্তেজনা চান না। তারা চান সব পক্ষের মধ্যে শান্তি বিরাজ করুক।

এদিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর ইরানের অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে দাফন করা হয়েছে। বুধবার তার নিজ শহর কেরমানে ইরানের শীর্ষ এই সামরিক কমান্ডারকে দাফন করা হয়। 

মঙ্গলবার কেরমানে সোলেইমানির জানাযায় লাখো লোকের সমাবেশ হয়। সেখানে জানাযা অংশগ্রহণ করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে হত্যা করা হয় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে।

এদিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বাগদাদ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মঙ্গলবার রাতে ওই হামলার পর কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান জোনাথন ভ্যান্স ওই কথা জানান। খবর বিবিসি।

জোনাথন ভ্যান্স জানান, এই হামলার পর তাদের সৈন্যদের নিরপত্তার স্বার্থে ইরাকে মোতায়েন ৫০০ সৈন্য কুয়েতে সরিয়ে নেয়া হবে।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.