​করোনা ভাইরাস: জাপানে প্রমোদতরীতে ১৭৫ জন আক্রান্ত

জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজে নতুন করে ৩৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে অবরুদ্ধ (কোয়ারেন্টাইন) জাহাজটিতে এক কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাসহ আক্রান্ত বেড়ে ১৭৫ জন হয়েছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এএফপি, সিএনএন, আলজাজিরা।

মঙ্গলবার জাহাজের ৫৩ যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ৩৯ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। আক্রান্তদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া পূর্বে হাসপাতালে ভর্তি ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে আটকে আছে এ জাহাজটি। এখন পর্যন্ত জাহাজের ১৭৪ যাত্রীর শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত যাত্রীদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বাকিদের আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাহাজেই কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’ নামের ওই বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজে ২ হাজার ৬৬৬ জন যাত্রী ও ১ হাজার ৪৫ জন ক্রু রয়েছে। সকল যাত্রীদের পরীক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জাহাজে রয়েছেন। তাদেরকে জাহাজে নিজ রুমে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ওই হাজাজে পূর্বে ভ্রমণ করা এক যাত্রী ২৫ জানুয়ারি হংকংয়ে গিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেয়ার পর জাপান জাহাজটিকে অবরুদ্ধের এ পদক্ষেপ নেয়। এছাড়াও জাহাজে ভ্রমণকারী ৮ যাত্রীর শরীরে জ্বর ছিল, যা করোনা’র একটি আলামত।

সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জাহাজটি জাপানের ইয়োকোহামা উপসাগরে আসে বলে জানান দেশটির সরকারের মুখপাত্র ইয়োশিদে সুগা। 

এদিকে, করোনা ভাইরাসে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। চীনের বাইরে হংকং ও ফিলিপাইনে ১ জন করে মোট ১ হাজার ১১৫ জন নিহত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এতে  ৯৭ জন নিহত হয়েছে। তবে গতকাল থেকে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। গতকাল মারা গিয়েছিল ১০৮ জন। 

এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ হাজার ৬৫৩ জন এবং চীনের বাইরে ৫১৫ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ১৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭৪৪ জন। এর আরও ৪ হাজার ৭৭১ জন সুস্থ হয়েছে। বুধবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছে। 

বুধবার সকালে চায়নার জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, চীনে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৫ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৪৪ হাজার ৬৫৩ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ জনের অবস্থা ভয়াবহ বলে জানানো হয়েছে। পর্যবেক্ষণে রয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। 

চীনে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ৪ হাজার ৭৭১ জন সুস্থ হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর তাদেরকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪ হজার ৭৭১ জন মানুষ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র পেয়েছে। শুধু গতকালই সুস্থ হয়েছে ৭৪৪ জন।

হুবেই প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুবেইতে নতুন করে ১ হাজার ৬৩৮ জন আক্রান্তের খবর নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৬৮ জন, আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৬৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯৭ জনের মধ্যে ৯৪ জনই হুবেইতে, বাকি ৩ জন মারা গেছে চীনের অন্যান্য এলাকায়।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১০৪ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না। কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে। তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ৫১৫ জন আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। 

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ। ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে। ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

দেশটির সব প্রদেশে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু দেশটির কারখানাগুলোতে দিনে মাত্র ২ কোটি মাস্ক তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চীনের শিল্প-প্রতিষ্ঠানবিষয়ক বিভাগের মুখপাত্র তিয়ান ইউলং। 

তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ ইউরোপ, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্ক আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কাজাখস্তান, হাঙ্গেরিসহ বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশ মেডিকেল সহায়তায় হাত বাড়িয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান ও ইসরায়েলস ২৫টি দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগীকে শনাক্ত করা হচ্ছে।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.