ঝুঁকিতে গ্রামীণ হাট-বাজার!

নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার হাটগুলোতে মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রবল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের জমজমাট ভিড় দেখা গেছে। একইসঙ্গে গ্রামের মানুষের মধ্যে সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারেও লক্ষ্য করা গেছে অনীহা।

উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারাও চিন্তিত। অভিযানে গেলে বাজার খুব কম সময়েই খালি হয়ে যায়। কিন্তু অভিযান শেষ করে ফেরার পরেই হাটগুলোতে ফের মানুষ ভিড় করছেন বলে তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মতে, বিষয়টা অনেকটা লুকোচুরি খেলার মতো। অভিযানে গেলেই বাজার খালি, আবার অভিযান থেকে ফেরার পরেই বাজার হয়ে যায় জমজমাট!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ রোধে দুজন মানুষের মধ্যে কমপক্ষে এক মিটার দূরত্ব থাকা জরুরি। কিন্তু ফটিকছড়ি, পটিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়াসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার কাঁচাবাজারগুলোতে কোনোভাবেই মানুষের ভিড় কমানো যাচ্ছে না।

উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। কোথাও কেবল টিভিতে দেখানো হচ্ছে বিজ্ঞাপন। সকাল-বিকাল এমনকি সন্ধ্যায়ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, বাজারগুলোতে কমছে না মানুষের ভিড়।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরে আলম জানান, ‘আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে বোঝানোর জন্য। মাইকিং করা হচ্ছে। তারপরও কাজ হচ্ছে কম। আসলে মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে একটু হেলাফেলা ভাব চলে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত টহলে যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি, এসিল্যান্ড যাচ্ছেন, সঙ্গে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা থাকছেন। যখন আমরা টহলে যাই, তখন পালিয়ে যায়, আবার আমরা চলে আসলেই তারা জমায়েত হয়। আসলে মানুষ মনে হয় একটু রিলাক্স হয়ে যাচ্ছে। তবু আমরা চেষ্টা করছি। চেয়ারম্যান সাহেবদের সঙ্গে মিটিং করেছি। দেখি কী হয়।’

বাজারে আগতদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন এ ব্যাপারেও কিছুটা রিলাক্স হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। তারপরও আমরা মাস্ক বিতরণ করছি। মাইকিং করে মাস্ক ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছি। এভাবে সচেতনতা তৈরি আসলে কঠিন। তবু আমরা চেষ্টা করছি।’

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সায়েদুল আরেফিন জানান, ‘দেখুন, ফটিকছড়ি তো অনেক বড় একটা এলাকা। আমরা সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে যে বাজারেই যাই, মাইকিং করার সঙ্গে সঙ্গে বাজার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আবার আমরা চলে আসার কিছুক্ষণ পর আবার দেখা যায় লোকজন চলে আসছে। সব দোকান-পাট কিন্তু বন্ধ। চায়ের দোকানও বন্ধ করে দিয়েছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা টহল দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘সারাদিন বাজারে বাজারে, অলি-গলিতে ঘুরছি। কিন্তু প্রশাসনের সবসময় তো সব জায়গায় থাকা সম্ভব হয় না। মানুষ সে সুযোগটাই নিচ্ছে। গ্রামের মানুষ চেয়ারম্যানদের কথাও শোনে না। চেয়ারম্যানরা বলছেন, সতর্ক করতে গেলেই তাদের নিয়ে গ্রামের মানুষ হাসি-ঠাট্টা করে। এটাই আসলে বাস্তবতা।’

উপজেলায় অধিকাংশ মানুষ মাস্ক পরে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন অনেকেই দূরত্ব মেনে চলছেন। তবে বাজারে যখন আসছেন, সবজি কিনছেন, তখন দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে কোনো দূরত্বই থাকছে না।’

কোন কোন বাজারে ভিড় বেশি হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ফটিকছড়ি বাজার ও নাজিরহাট বাজারে ভিড় বেশি হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বের হচ্ছি। বাজারগুলো ঘুরে ঘুরে মনিটর করছি।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোমেনা আক্তার জানান, ‘বাজারগুলোতে ভিড় কমানোর ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা লক্ষ্য করেছি সন্ধ্যাবেলায় এ সমস্যাটা বেশি হয়। বিষয়টা আমরা সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। সন্ধ্যায় তাদেরকে টহল বাড়াতে বলেছি এবং তারা আমাদের সেভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে।’

চাম্বল বাংলাবাজারে ভিড় বেশি হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাজারে ভিড় বেশি হচ্ছে বলে কয়েকজন টেলিফোনে আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা করছি। আপনাদের নজরে যদি তেমন কিছু আসে, আমাদের জানাবেন, আমরা বিষয়টা দেখব।’

গত কয়েকদিনে ভিড় আগের চেয়ে কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে লোকাল কেবল টিভিতে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিদিনই সেই বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে।’

গ্রামের মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শতভাগ আসলে তো নিশ্চিত হয়নি। কিন্তু মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জুবাইর আহমেদ জানান, ‘আমরা টহল দিয়ে যাওয়ার পর লোকজন আবার বাজারে চলে আসে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাইকিং করেন। কিন্তু তারা চলে গেলে আবার চলে আসেন। কী করা যায় বলেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল-বিকাল এমনকি সন্ধ্যায়ও আমরা মনিটরিংয়ে যাই। কিন্তু কোনোভাবেই তাদের নিরস্ত করা যাচ্ছে না। আমরা এক বাজার শেষ করে আরেক বাজারে মনিটরিংয়ে গেলে আগের বাজারে চলে আসে লোকজন।’

বাজারে আগতদের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাস্ক তাদের থাকে। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বলে যে বিষয়টা আছে সেটা ব্যাহত হচ্ছে।’

উপজেলার বটতলী বাজারে ভিড় বেশি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরাতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা তো একরকম লুকোচুরি খেলছে আমাদের সঙ্গে। আমরা গেলাম। তারা লুকিয়ে পড়ল। আবার আমরা চলে আসলেই আবার তারা বাজারে চলে আসে।’

আনোয়ারার প্রবাসীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা সবাই বাড়িতে আছেন। তারা বাইরে বের হলে এলাকার লোকজনই তাদের বাধা দেয়। তিরস্কার করে। তাই প্রবাসীদের নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার সমস্যা সাধারণ গ্রামবাসীদের নিয়ে।’

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.