‘পাবনা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নাম পরিবর্তনে প্রতিবাদের ঝড়

হঠাৎ করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নাম পরিবর্তন করে ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ নামকরণে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে পাবনায়। গেল ১০ জানুয়ারি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের নাম পরিবর্তন করে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি অধ্যুষিত সন্ত্রাস কবলিত এলাকা হিসেবে খ্যাত ইউনিয়ন ঢালারচর’র নামানুসারে ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ করার ঘটনায় রাজশাহী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক রেজাউল করিম নামে জনৈক রেলওয়ে কর্মকর্তার যোগসাজসে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বলে প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। 

পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের নাম পরিবর্তন করে ঢালারচর এক্সপ্রেস নামকরণ করায় সোমবার পাবনা শহরের কয়েকটি স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও পথ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের বন্ধু সংগঠন শুভসংঘ’র ব্যানারে পাবনা সেন্ট্রাল গালর্স হাইস্কুলের সামনে প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

অপরদিকে উত্তরণ সাহিত্য আসরের ব্যানারে পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে ঘণ্টাব্যাপী আরেকটি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ অবিলম্বে পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের নামকরণ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

পাবনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আঁখিনূর ইসলাম রেমন বলেন,পাবনা একটি ইতিহাস সমৃদ্ধ জেলা। প্রধানমন্ত্রী সমৃদ্ধ জেলার নামানুসারেই পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি উদ্বোধন করে দীর্ঘ ৪০ বছরের দাবির অবসান করেছিলেন। একটি কুচক্রি মহলের যোগসাজসে ট্রেনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই নাম বহালের জোর দাবি জানাচ্ছি।

পাবনা প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, যে কুলাঙ্গার ইতিহাস সমৃদ্ধ পাবনার সাথে বেঈমানি করতে পারে, সে পাবনার ভালো কিছু সহ্য করতে পারে না। ঢালারচর একটি সন্ত্রাস কবলিত জনপদ। যেখানে রাতদিন মানুষকে গুলি বোমা আর লাশের মধ্যে থাকতে হতো। যেখানে সাধারণ মানুষ ও আইন- শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত নিরাপদ ছিল না। সেই জনপদের নামানুসারে ট্রেনের নামকরণ করা মানে রেলওয়ে বিভাগের খামখেয়ালীপনা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।  

সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী কামাল সিদ্দিকী বলেন, রেলওয়ের জনৈক কর্মকর্তা পাবনার মানুষ হয়ে পাবনার সাথে বেঈমানি করেছেন। ঢালারচর এক্সপ্রেস নয় পাবনা এক্সপ্রেস বহালসহ এই জঘন্য কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের ড. নরেশ মধু বলেন, কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কারণে সরকারের কল্যাণকর কাজেও দুর্নামের ভাগিদার হতে হয়। সেইসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠির মধ্যে সরকারিভাবে সুনাম বজায় রাখতে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যে ট্রেন উদ্বোধন করলেন, সেই ট্রেনের নাম কিভাবে পরিবর্তন করে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেয়া হয়, যেটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। অবিলম্বে পাবনা এক্সপ্রেস নামকরণ বহাল রাখার জোর দাবি জানাই।

মাছারাঙা টেলিভিশনের উত্তরাঞ্চলীয় ব্যুরো চীফ উৎপল মির্জা বলেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিবাদই এক সময়ে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নেয়। নতুন করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ট্রেনের সময়সূচি ও  নাম পরিবর্তনের কপি হাতে আসার সাথে সাথেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতে আপলোড করেছি। আজ একই প্রতিবাদেই রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে। আমাদের এই দাবি মানা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।

সাংবাদিক সৈকত আফরোজ আসাদ বলেন, এ মাসেই রাজশাহী থেকে ঢালারচর পর্যন্ত ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি আনুষ্ঠানিক ভাবে যাতায়াত শুরু করবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই পাবনা এক্সপ্রেস নামবহাল করা না হলে রাজশাহী-ঢালারচর রেলপথ অবরোধ করা হবে। 

ব্যবসায়ী বিনয় জ্যোতি কুন্ডু বলেন, রেলপথ ছিল না বলেই আমরা আজ বঙ্গবন্ধু সেতু হারিয়েছি। কিন্তু আর না। ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। রেলপথ চালু হবে। হয়তো এই পথ দিয়ে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর মাধ্যমে আমরা রাজধানীর সাথে সহজে যাতায়াত করতে পারবো। কিন্তু একটি অশুভ শক্তির ইন্ধনে ষড়যন্ত্রর নতুন ফাঁদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তাতে কোন লাভ নেই। পাবনাবাসী সর্বক্ষেত্রেই সোচ্ছার ভূমিকায় থেকেছে, থাকবে।

নাট্যকর্মী শিশির ইসলাম বলেন, পাবনাবাসী বিভিন্ন সময়ে দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছে। আবার নামবে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনের নাম পরিবর্তন করে পাবনাবাসীকে বিব্রত ও অসম্মানিত করেছে। আমরা রেলপথে অবরোধ করে রেল চলাচল বন্ধ করে দিবো। আমাদের একটি দাবি, পাবনা সম্মান, পাবনার গৌরব ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামটি অবিলম্বে বহাল রাখা হোক। 

উত্তরণ সাহিত্য আসরে কর্ণধার, কবি, সাহিত্যিক ও লেখক আলমগীর কবির হৃদয় বলেন, পাবনাকে হৃদয় থেকে ভালোবাসি। পাবনাকে ধারণ করি, লালন করি। পাবনার মমত্ববোধেই আজ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। রেলওয়ে তথা কুলাঙ্গার এক কর্মকর্তার কারণে আজ আমরা রাজপথে। আরও বৃহত্তর কোন কর্মসূচি গ্রহণের আগেই পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের নামকরণ বহাল রাখার জোর দাবি জানাচ্ছি।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মাজগ্রাম হয়ে পাবনা স্টেশন পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ ও পাবনা এক্সপ্রেস নামের একটি ট্রেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পাবনার কয়েকটি মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ও সমাবেশে গণমাধ্যম কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণির পেশার মানুষ স্বতঃর্স্ফূতভাবে অংশগ্রহণ করেন।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.