বিপ্লবী মহানায়ক মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি

যাদের আত্মত্যাগে ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি, পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি সেইসব সংগ্রামী সাধকদের অন্যতম, ইতিহাসে চির উজ্জ্বল অবিস্মরণীয় এক নাম।

১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ পূর্ব পাঞ্জাবের সিয়ালকোট জেলার চিয়ানওয়ালিতে এক শিখ পরিবারে তার জন্ম। জন্মের আগেই পিতাকে হারান। দুই বৎসর বয়সে অভিভাবক দাদাকেও হারিয়ে পাঞ্জাবস্থ ডেরাগাজি-খান জেলায় মামাবাড়ি এসে বসবাস করতে শুরু করেন। তার নাম ছিল বুটা সিং। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুব তেজস্বী ও জেদি।

 

মহানায়ক

ছয় বছর বয়সে জামপুর উর্দু মিডল স্কুলে ভর্তি হন। সাধারণ গণিত, বীজগণিত, ইউক্লিড ও ভারতের ইতিহাসে তার খুব আগ্রহ ছিল। বই পড়ার নেশা ছিল, হাতের নাগালে যেই বই পেতেন পড়ে ফেলতেন।

 

এভাবেই বই পড়তে গিয়ে মাওলবি ওবায়দুল্লাহ মালিরকোটলবি রচিত ‘তুহফাতুল হিন্দ’ পাঠ করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।

মাওলানা সিন্ধি বলেন, ‘আমি খুব মনোযোগ সহকারে বইটি পড়েছি, এমনকি পড়তে পড়তে মুখস্থ করে ফেলেছি। এই বইয়ের বদৌলতে আল্লাহ আমাকে ইসলামি বিশ্বাস গ্রহণের তৌফিক দান করেছেন।’ তারপর তিন বৎসর গোপনে গোপনে নামাজ-রোজা করেছেন।

 

শাহ ইসমাইল শহীদের ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ পড়ার তার মধ্যে প্রচণ্ড ভাবাবেগ তৈরি হয়। তারপর ১৫ কী ১৬ বছর বয়সে, ১৮৮৭ সালের ১৫ই আগস্ট, যখন তিনি মাধ্যমিকের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন, ইসলাম গ্রহণ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তার পরিবার শত্রুতা পোষণ করতে থাকলে তিনি পাঞ্জাব থেকে সিন্ধুতে চলে যান, এবং ‘তুহফাতুল হিন্দ’-এর লেখকের নামে নিজের নাম ওবায়দুল্লাহ রাখেন। (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ, মুখতাসার নুকুশে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ১১৬)

 

ভাগ্যের অনুসন্ধান তাকে সেই সময়ের আরেফে বিল্লাহ সাইয়িদুল আরেফিন হজরত হাফেজ মুহাম্মদ সিদ্দিক-এর খেদমতে (ভরচণ্ডি শরিফ, সিন্ধু) নিয়ে হাজির করে। তিনি তাকে পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন।

 

তিনি ছিলেন রাশেদিয়া কাদেরিয়া সিলসিলার পীর, ঘটনাক্রমে তিনি শাহ ইসমাইল শহিদ-এর সাহচর্যে থেকেছিলেন। তার তত্ত্বাবধায়নে কিশোর ওবায়দুল্লাহর মন-মগজ ও ব্যক্তিত্বকে এমন এক ছাঁচে ঢালা হয়— যার নাম ‘তাহরিকে ওলিউল্লাহি’ বা ‘ওলিউল্লাহ দেহলবির ফিকরি আন্দোলন’। (কিয়া মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি ইশতিরাকিইয়াত সে মুতাআসসির হো গায়ে থে, মওলানা জাহিদুর রাশদি)

 

মওলানা সিন্ধি বলেন, আমি আমার সুমহান মুর্শিদদের প্রতি যারপরনাই কৃতজ্ঞ যে, তারা আমার স্বভাবগত সাধারণ যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে বিশ্বব্যাপী মানুষের মুক্তিতে নিবেদিত মনোভাবে বদলে দেন, এবং আমার জীবনের উদ্দেশ্যকে গতিময় করেন। (শুউর ও আগাহি, মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, পৃষ্ঠা ৫১)

 

ভরচন্ডি শরিফেই তিনি আরবির প্রাথমিক পাঠ সমাপন করেন। মোজাফফরগড়ে মওলানা খোদাবখশের কাছে আরবি ব্যাকরণের প্রসিদ্ধ কিতাব কাফিয়া পড়েন। এরপর ১৮৮৮ সালে উচ্চতর পড়াশোনার উদ্দেশে দারুল উলুম দেওবন্দে রওনা দেন। সেখানে তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্র, হাদিস, তফসির, তর্কশাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

 

ওস্তাদ হিসেবে পেয়েছিলেন মাওলানা আবদুল কাদের, মাওলানা আহমদ হাসান কানপুরি, মাওলানা হাফেজ আহমদ, মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি ও শায়খুল হিন্দের মতো উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আলেমদের। পরীক্ষায় প্রত্যেক বিষয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হতেন।

 

মাওলানা সাইয়িদ আহমদ দেহলবি তার পরীক্ষার খাতা বলেছিলন, এই ছেলে যদি যথেষ্ট কিতাবের জোগান পায়, তাহলে দ্বিতীয় শাহ আবদুল আজিজ হবে।

 

উল্লেখ্য, শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি ছিলেন শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির পুত্র ও খলিফা, এবং ভারতের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আলেমদের একজন। (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ, মুখতাসার নুকুশে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ১১৭)

 

নিজ যোগ্যতাবলে মাওলানা সিন্ধি দারুল উলুম দেওবন্দের অধ্যক্ষ ও স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দির একান্ত প্রিয় ছাত্রদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। (দারুল উলুম দেওবন্দ কা সদ সালা যিন্দেগি, পৃষ্ঠা ৬৮)

 

দারুল উলুম দেওবন্দে স্নাতক ছাত্রদের সম্মানসূচক পাগড়ি প্রদান করা হয়, সাধারণত বাজার থেকেই সেই পাগড়ি খরিদ করে আনা হতো, কিন্তু মাওলানা সিন্ধির বেলায় শায়খুল হিন্দ (রহ) নিজ মাথা থেকে পাগড়ি খুলে তাকে পরিয়ে দেন।

 

১৮৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিন্ধুতে ফিরে এসে জানতে পারেন মাত্র দশ দিন আগে পিতৃতুল্য মুর্শিদ হাফেজ মুহাম্মদ সিদ্দিক ইন্তেকাল করেছেন। তিনি খুব ব্যথিত হন। এরপর তিনি আবুল হাসান তাজ মাহমুদ ইমরোটি সাহেবের সান্নিধ্যে সেখর জেলায় যান, সেখানেই বিয়ে এবং তৎপরবর্তীতে সাত বৎসর শিক্ষকতা করেন।

 

এই সাত বৎসর তিনি শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি, শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি, শাহ ইসমাইল শহিদ ও মাওলানা কাসেম নানুতবির কিতাবপত্র পঠন-পাঠনের কার্যক্রম চালান এবং প্রায় দশটি কিতাবের টীকা, ভাষ্য ও ব্যাখ্যা লিখেন। এই সময় সিন্ধি ভাষায় ‘হেদায়াতুল ইখওয়ান’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।

 

১৮৯৭ সালের নভেম্বরে তিনি দেওবন্দে তশরিফ রাখেন, এবং হজরত শায়খুল হিন্দকে স্বরচিত কিতাবাদি দেখান। শায়খুল হিন্দ খুব খুশি হন।

 

তিনি তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলনে পুরোদমে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তো মাওলানা সিন্ধিকে তার সাথে রাজনৈতিক কাজে অংশ নিতে, এবং সিন্ধুতে দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ করেন।

 

১৯০১ সালে সিন্ধুতে গোঠ পির ঝান্ডা এলাকায় মওলানা সিন্ধি দারুর রশাদ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, এখানে বসেই তিনি সাত বৎসর রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যান, এবং বিপ্লবী মানসিকতার আলেম তৈরি করতে থাকেন। শিক্ষা-দীক্ষায় এই মাদরাসার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

এই মাদরাসা প্রদর্শনে শায়খুল হিন্দ ও মাওলানা হুসাইন বিন মুহসিন আনসারির মতো মহান ব্যক্তিরাও গিয়েছিলেন।

 

দারুর রাশাদে থাকাকালেই মওলানা সিন্ধি হজরত ইমাম মালেক ও আল্লাহর রসুল (স)-কে স্বপ্নে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন। (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ, মুখতাসার নুকুশে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ১২১)

 

১৯০৯ সালের অক্টোবরে মওলানা সিন্ধি শায়খুল হিন্দের নির্দেশ পেয়ে দেওবন্দে গমন করেন, এবং তার অধীনে জমিয়তুল আনসার নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন, তিনি হন পরিচালক।

 

মাওলানা সিন্ধি বিগত চল্লিশ বছরে যারা দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে স্নাতক হয়েছেন, তাদের তালিম-তরবিয়ত দিতে থাকেন, এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সভা-সমাবেশ করে তাদের মনে স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে দেন। শায়খুল হিন্দের হুকুম মাফিক চার বৎসর তিনি এই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

 

এই সময় ইংরেজদের প্রশাসনিক রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তর করে দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। ইংরেজ গোয়েন্দারা দেওবন্দ মাদরাসায় নজরদারি করতে শুরু করেন।

 

ঠিক এমন পরিস্থিতিতে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধিকে মতবিরোধ তৈরি করছে অভিযোগ দিয়ে কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়, এবং দেওবন্দ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

 

মাওলানা আসআদ মাদানি লিখেন, মাওলানা সিন্ধিকে দেওবন্দ থেকে সরানোর পেছনে সরাসরি ইংরেজ সরকারের হাত ছিল। (মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি আওর উন কে চান্দ মুআসির, পৃষ্ঠা ১১৩)

 

১৯১৩ সালে মাওলানা সিন্ধি মসজিদে ফতেহপুর চাঁদনিচক দিল্লিতে নাযযারাতুল মাআরিফ আল কুরআনিইয়াহ’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন শায়খুল হিন্দ, হাকিম আজমল খান ও নওয়াব ভিকারুল মুলক।

 

এখানে তিনি শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি রচিত ‘আল ফাওজুল কাবির’-এর ভিত্তিতে কোরআনের তফসির, এবং হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’র নীতিতে রাজনৈতিক দর্শন পড়াতে শুরু করেন।

 

এই সংগঠনেই শায়খুল হিন্দ মওলানা সিন্ধির সাথে ডক্টর মুখতার আহমদ আনসারি, মওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের পরিচয় করিয়ে দেন। তারা সবাই ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে সহযোদ্ধা ছিলেন। (মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মুহাম্মাদ সারওয়ার, লাহোর ১৯৬৪, পৃষ্ঠা ২৯)

 

১৯১৫ সালে তিনি শায়খুল হিন্দের নির্দেশনায় কাবুল রওনা দেন। কিন্তু ইংরেজ গুপ্তচরদের নজরদারি থেকে বাঁচতে চার মাস সিন্ধুতে গোপনে প্রস্তুতি নেন। ১৫ আগস্ট সিন্ধুতে থেকে কান্দাহারে যান, তারপর বালুচিস্তান হয়ে অক্টোবরে কাবুলে গিয়ে পৌঁছান।

 

এরই মধ্যে তিনি ‘জুনুদুল্লাহির রব্বানিইয়াহ’ নামে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারত স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা, এবং জায়গায় জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি ইংরেজদের ব্যস্ত রাখা। (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ, মুখতাসার নুকুশে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ১২২)

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, এই সময় তিনি প্যান-ইসলামিক আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি আফগানিস্তানের আমির হাবিবুল্লাহ খানকে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য প্রস্তাব দেন।

 

অন্যদিকে শায়খুল হিন্দ জার্মান ও তুর্কিদের সাহায্য চান, এবং হেজাজের দিকে অগ্রসর হন। এবং তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে উপমহাদেশ থেকে উৎখাত করতে তুর্কি-জার্মানদের সাথে মৈত্রীচুক্তি স্থাপন করতে সক্ষম হন। এই মিশনের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানের আমিরের ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়া এবং আফগান সরকারের কাছ থেকে চলাচলের উন্মুক্ত পথ লাভ করা।

 

কিন্তু পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর শীর্ষ দেওবন্দি নেতারা গ্রেফতার হন। শায়খুল হিন্দকে মক্কা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে ও হুসাইন আহমদ মাদানিকে মাল্টায় নির্বাসন দেওয়া হয়। মাওলানা সিন্ধি গ্রেফতার এড়াতে কাবুলেই রয়ে যান।

 

রেশমি রুমাল আন্দোলন প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ গোয়েন্দা রিপোর্টে লেখা হয়েছিল— ‘মুসলমান জাতির এক অংশ তখনও (১৯১৪ – ১৯১৫) ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে লিপ্ত ছিল। জেহাদি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাড়াও আরও এক দল মুসলমান বিদেশি রাষ্ট্র কাবুল ও তুরস্কের সহায়তায় ইংরেজ বিতাড়নের ষড়যন্ত্র করছিল। তাদের নেতা ছিলেন দেওবন্দ মাদরাসার মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ও তার সহকর্মী মাওলানা মাহমুদ হাসান (শায়খুল হিন্দ)। তারা হেজাজ ও কাবুলে উপমহাদেশীয় মুসলিম প্রবাসীদের সহায়তায় ও কাবুলের আমিরের সাহায্যে বিদ্রোহ ষড়যন্ত্র করেছিলেন।

 

১৯১৬ সালে মাওলানা সিন্ধি কাবুলে রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে রাষ্ট্রপ্রধান ও মওলানা বরকতুল্লাহকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে ‘প্রবাসী ভারত সরকার’ গঠন করেন, আর তিনি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মওলানা তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বের দ্বারা আফগান সরকারকে প্রভাবিত করেছিলেন।

 

১৯১৭ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে আমির হবিবুল্লাহ খান কাবুলে মওলানা সিন্ধিকে ও অন্যান্য বিপ্লবী দলের নেতৃবৃন্দকে নজরবন্দি করেন এবং প্রবাসী ভারত সরকারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

 

মাওলানা সিন্ধিসহ বিশ-পঁচিশজনকে একটি ছোট্ট কুঠরীতে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরে মাওলানাকে জালালাবাদে স্থানান্তরিত করা হয়।

 

১৯১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে আমানুল্লাহ খান কাবুলের মসনদে আসীন হলে দীর্ঘ ১ বছর ৮ মাস পর মওলানা সিন্ধিকে কারামুক্ত করে কাবুলে ফিরিয়ে আনেন। এরপর তিনি ৩ বছর ৮ মাস আমানুল্লাহ খানের আস্থাভাজন হিসাবে আফগান সরকারের কল্যানে কাজ করে যান।

 

১৯১৯ সালের মে মাসে আমানুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ ভারতের যুদ্ধ বাঁধলে মওলানা সিন্ধি জুনুদুল্লাহির রব্বানিইয়াহ’ বাহিনী যুদ্ধে প্রেরণ করেন। তার আশ্চর্য কূটকৌশলে সেই যুদ্ধে ইংরেজরা পরাস্ত হয়।

 

১৯২২ সালে ‘প্রবাসী ভারত সরকারের’ বিকল্প হিসাবে কংগ্রেসের শাখা ‘কাবুল কংগ্রেস কমিটি’ গঠন করেন, তিনি এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই কমিটি সরাসরি ন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ইন্ডিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখত। (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ, মুখতাসার নুকুশে জিন্দেগি, পৃষ্ঠা ১২২)

 

তিনি সাত বৎসর কাবুলে অবস্থান করেছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে তাকে কাবুল ছাড়তে হয় বাধ্য হয়। এভাবেই তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।

 

কাবুলে থাকাকালীন পনের জন ছাত্র লাহোর থেকে পালিয়ে মওলানা সিন্ধির সাথে দেখা করেন। অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমদ তার আত্মজীবনী আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ গ্রন্থে ওই ছাত্রদের তালিকা ও তাদের ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

 

তারা হলেন আবদুল বারি, আবদুল কাদির, আবদুল মজিদ খান, আল্লাহ-নওয়াজ খান, আবদুল্লাহ, আবদুর রশিদ, গোলাম হুসাইন, জাফর হাসসান এবক, আবদুল খালিক, মুহম্মদ হাসসান, খুশি মুহম্মদ, আবদুল হামিদ, রহমত আলী, সুজাউল্লাহ ও আল্লাহ-নেওয়াজ।

 

মওলানার সংস্পর্শে তাদের মধ্যে বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠে। এরমধ্যে খুশি মুহম্মদ মওলানা সিন্ধির মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবেও ছিলেন। পরবর্তীতে এদের এক অংশ বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যায়।

 

এমআর আখতার মুকুল তার কমরেড খুশি মুহম্মদের অমর কাহিনী’ প্রবন্ধে বলেন, “রাশিয়ায় সর্বহারাদের বিপ্লব সফল হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯১৫ সালে লাহোর থেকে কাবুলে আগত সেই ১৫ জন ছাত্রের মধ্যে আদর্শের প্রশ্নে বেশ মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

 

খুশি মুহম্মদ ওরফে মুহম্মদ আলী ওরফে আহমদ হাসান এসময় নিজেকে সমাজতন্ত্রের আদর্শের একজন কর্মী হিসেবে ঘোষণা করে। তার অন্তরঙ্গ বন্ধু গোলাম হুসাইনও মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।

 

মেডিকেল এর ছাত্র আবদুল হামিদ মস্কো চলে যায় এবং সেখানে শ্রমজীবী প্রাচ্যের কমিউনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করে।

 

পলাতক ছাত্রদের মধ্যে মেডিকেলের আরেক ছাত্র রহমত আলীও নিজেকে কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং ১৯১৯ সালের ৯ই জুন তারিখে তাসখন্দ-এ অনুষ্ঠিত তুর্কিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে ভারতের পক্ষ থেকে বক্তৃতাদান করেছিল।

 

পরবর্তীতে প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই মেডিকেলের ছাত্র রহমত আলী ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে। তার থিসিসের বিষয় ছিল “মার্কসীয় দৃষ্টিতে ভারতের হিন্দু-মুসলমান সমস্যা” এবং ভাষা ছিল ফরাসি।

 

আর ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর তাসখন্দ নগরীতে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ৭ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম ছিল উপরোক্ত খুশি মুহম্মদ ওরফে মুহম্মদ আলী। সে তার সমস্ত জীবন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িত থেকে মস্কো থেকে প্যারিস পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছে।” (‘গয়রহ’, এমআর আখতার মুকুল)

 

কমরেড মুজফফর আহমদ তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ গ্রন্থের ৭৪-৭৬ পৃষ্ঠায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাতজন প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে খুশি মুহম্মদ ছাড়াও মুহম্মদ শফিক নামে আরেকজনের কথা উল্লেখ করেছে।

 

মুহম্মদ শফিক ছিল তাসখন্দে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সভার নির্বাচিত সেক্রেটারি, অর্থাৎ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিরই প্রথম সেক্রেটারি। এই কমরেড শফিকও ছিল মওলানা সিন্ধির অনুসারী এবং কাবুলে হিজরতকারী।

 

১৯২২ সালে মাওলানা সিন্ধি যখন কাবুল থেকে তুরস্কের উদ্দেশে রওনা দেন, গ্রেফতারি এড়াতে রাশিয়ার দিকে চলে যান। ভারত কংগ্রেসের লিডার পরিচয়ে তিনি মস্কোতে সাত মাস অবস্থান করেন, এই সময় সমাজতন্ত্রের বইগুলো অধ্যয়ন করেন। (দেওবন্দ উলেমাস মুভমেন্ট ফর দ্য ফ্রিডম অফ ইন্ডিয়া, প্রকাশনায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, ড. ফারহাত তাবাসসুম, পৃষ্ঠা ১৩২)

 

ওলিউল্লাহি দর্শনের আলোকে মাওলানা সিন্ধির অর্থনৈতিক ন্যায্যতার মতবাদ, মস্কোতে অবস্থান ও কমিউনিস্টপন্থী ছাত্রদের কারণে অনেকেই মনে করেন তিনি সমাজতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, এমনকি সুলাইমান নদবিও তার এক প্রবন্ধে লিখেন, ‘বলতে পারি রাশিয়া থেকে তিনি পুরোপুরিভাবেই বলশেভিক আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হন।’ কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়।

 

খোদ মাওলানা সিন্ধি নির্বাসনের শেষদিকে, ভারতে ফিরে আসার কয়েক মাস আগে তার আত্মজৈবনিক রচনা ‘মেরি জিন্দেগি’র ১২ নং পৃষ্ঠায় লিখেন, ‘১৯২২ সালে আমি তুর্কি সফরে গিয়েছিলাম, সাত মাস মস্কো ছিলাম, নওজোয়ান বন্ধুদের সহায়তায় সমাজতন্ত্র নিয়ে পড়েছিলাম।

 

ততদিনে ন্যাশনাল কংগ্রেসের সাথে ইংরেজ সরকারের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, সোভিয়েত রাশিয়া তাই আমাকে ‘বিশেষ সম্মানিত মেহমান’ বানায়, এবং পাঠপর্ব চালিয়ে যেতে সবধরনের সহায়তা করে। (একথা সত্য নয় আমি লেনিনের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ওই সময় লেনিন দুরারোগ্য এমন এক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল যে, খুব কাছের বন্ধুদেরও চিনতে পারত না।) আমার পাঠের ফল এই যে, আমি আমার ধর্মভিত্তিক আন্দোলনে— যা ওলিউল্লাহ দেহলবির চিন্তাদর্শনের একটি অংশ, ওই সময়ের ধর্মহীনতার হামলা থেকে বাঁচাতে তাতে নতুন ডাইমেনশন যোগ করতে কামিয়াব হই।

 

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে মওলানা সিন্ধির চিন্তাদর্শন সমাজতন্ত্র থেকে অনেক ভিন্ন ছিল, বরং তিনি শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির আদর্শের একজন প্রচারক। খোদ মওলানা সিন্ধি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতির ভাষণে বলেন শাহ ওলিউল্লাহ তার বৈপ্লবিক রাজনীতিতে জাহের ও বাতেনের রক্ষক ছিলেন আর শায়খুল হিন্দ ছিলেন রাহবার।

 

১৯২৩ সালে মাওলানা সিন্ধি রাশিয়া থেকে তুরস্কের আঙ্কারায় যান। সেখানে চার মাস থাকেন। তুরস্কে অবস্থানকালীন ইসমত পাশা, রউফ বেক প্রমুখ বিপ্লবীদের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। এরপর রাজধানী ইস্তাম্বুলে পৌঁছে তিন বছর অবস্থান করেন। এই সময় ইউরোপের ইতিহাস খুব মনোযোগের সাথে পড়েন।

 

বিশেষ করে অটোমান শাসনামল, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উত্থান— এসবের ওপর খুব মনোযোগ দেন।

 

১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে ইস্তাম্বুল থেকে ‘স্বাধীন ভারত উপমহাদেশের সংবিধানের খসড়া’ শিরোনামে ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতির গঠনপ্রণালী প্রণয়ন করেন। যার মূল পয়েন্ট ছিল :

 

(১) ভারত উপমহাদেশের অধিকাংশই জাতিরাষ্ট্র। এর বেশিরভাগ অঞ্চলের ভাষা সংস্কৃতি ভূ-প্রকৃতি ও জাতি আলাদা, তাই এখানে ডোমিনিয়ন স্টেট কায়েম করতে হবে। এমনকি কোনো জাতির সদস্য সংখ্যা পূর্বকালের মতো পাঁচ-ছয় শ জন হয়ে যায়, তবুও।

(২) ওই রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত হবে।

(৩) শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রতন্ত্রের নিয়মে হবে।

(৪) যুক্তরাষ্ট্র-সরকারের কাছে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি, মৈত্রীচুক্তির অধিকার থাকবে।

(৫) ‘সব মানুষ সমান’ নীতিতে শিক্ষাব্যবস্থা মাতৃভাষায় এবং নিজস্ব লিখনরীতিতে হবে।

(৬) ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বেশেষে প্রত্যেক নাগরিকের মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।

(৭) সব নাগরিকের প্রাথমিক পর্যায়ের সামরিক প্রশিক্ষণ (NCC) বাধ্যতামূলক হবে।

(৮) উর্দু সব জাতিরাষ্ট্রের সরকারি ভাষা হবে।

(৯) আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইংরেজি হবে সরকারি ভাষা।

(১০) প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর ভোট দেওয়ার অধিকার থাকবে।

 

(১১) কৃষক, কায়িক শ্রমিক, মেধাশ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং কলখারখানার মালিকদের নিজ নিজ বিষয়ে লাভ-ক্ষতির সঠিক পরিমাণ পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রত্যেক বৈঠকে উপস্থাপন করতে হবে, যেন পরিদর্শক সে-বিষয়ের কাজ করতে পারেন, এবং ক্রমশ দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারেন। (ইমামে ইনকিলাব হজরত মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, পৃষ্ঠা ৫)

 

১৯২৬ সালের জুন মাসে মাওলানা সিন্ধি ইতালি ও সুইজারল্যান্ড হয়ে শেষমেশ সুলতান ইবন সৌদের আমলে হিজাজে গিয়ে পৌঁছান। আগস্ট মাসে তিনি মক্কায় অবস্থান গ্রহণ করেন, এবং আবার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন।

 

১৯৩০ সালে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির চিন্তাদর্শন বাস্তবায়নে যারা চেষ্টাশ্রম ও সংগ্রাম করেছেন তাদের ওপর আরবি ভাষায় আত তামহিদ লি আইম্মাতিত তাজদিদ নামে একটি কিতাব লেখেন। তারপর শাহ ওলিউল্লাহ রুকআত বা পত্রাদির একটি ভূমিকা লেখেন।

 

১৯৩৭ সালে মক্কায় নির্বাসিত তুর্কি আলেম মুসা জারুল্লাহ মওলানা সিন্ধির তফসির সংকলন করে প্রকাশ করেন। (ই.ফা.বা., ইসলামী বিশ্বকোষ, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৬২৩)

 

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি ও মওলানা গোলাম রসুল মেহের প্রমুখের মতো বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ১৯৩৬ সালে ইংরেজ সরকারের কাছে আবেদন করে মাওলানা সিন্ধিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে, তো তারা ১৯৩৮ সালের পহেলা নভেম্বর অনুমতি প্রদান করে।

 

১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি পাসপোর্ট হাতে পান। তারপর হজ আদায় করে প্রায় পঁচিশ বছরের নির্বাসন শেষে মার্চের ৭ তারিখে মাওলানা সিন্ধি করাচি বন্দরে এসে পৌঁছান।

 

সুদীর্ঘ প্রবাস-জীবনে দেশবাসীকে কত কথাই-না বলার ছিল, দেশে ফিরে সেসব কথা বলার জন্য ব্যাকুল হলেন। কিন্তু তার কথা মানুষের মনঃপুত হলো না। অথচ তারা জানত না মাওলানার জীবনে কত তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো কত যে জরুরি।

 

তিনি বলতেন, ‘তোমরা এ যে খেলনার ঘর তৈরি করেছ এবং একেই আসমান বলে বিশ্বাস করে নিয়েছ, কালের প্রবাহের মুখে এ টিকে থাকতে পারবে না। তোমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, তোমাদের সমাজ, তোমাদের চিন্তাধারা, তোমাদের রাজনীতি এবং তোমাদের অর্থনীতি— সবকিছুর মধ্যে ঘুণ ধরেছে।

 

তোমরা একেই ইসলামি সভ্যতা নাম দিয়েছ, কিন্তু এতে ইসলামের কোনো চিহ্ন নেই। তোমরা তোমাদের গোঁড়ামিকেই ধর্মের নামে চালিয়ে নিচ্ছ। মুসলমান হতে চাও তো ইসলাম কী আগে বোঝ। তোমরা যাকে ইসলাম বলছ ইসলামের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

 

তোমাদের নেতৃবৃন্দ পদমর্যাদালোভী। তোমাদের শাসকবৃন্দ ভোগবিলাসী এবং তোমাদের জনসাধারণ বিভ্রান্ত। জাগো! পরিবর্তন আনো! নয়তো যুগ তোমাদের চিহ্ন পর্যন্ত মিটিয়ে দেবে।’ (শাহ ওয়ালীউল্লাহ ও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা, লেখক-পরিচিতি, পৃষ্ঠা ৯)

 

জুন মাসে তিনি জমিয়তে উলামা বাঙলা প্রদেশের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সভাপতির ভাষণে দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন।

 

১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তার সান্নিধ্যে উপস্থিত হন। নেতাজি কংগ্রেসের মতো ইংরেজদের নীতিতে স্বাধীনতা চাচ্ছিলেন না, একই ভাবধারার নেতা ছিলেন মাওলানা সিন্ধিও।

 

ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন, “নেতাজিকে যিনি পূর্ণ স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন তিনি হলেন ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি। তিনিই নেতাজির নাম দিয়েছিলেন মওলানা জিয়াউদ্দিন। তিনিই ছদ্মবেশে প্রথমে কাবুলে তারপর বিভিন্ন দেশে পাঠান।” (ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে উলামায়ে কেরামদের অবদান, পৃষ্ঠা ২৮)

 

১৯৪৪ সালে ইংরেজরা তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়, এবং সেখানেই কাপুরুষোচিতভাবে তাকে বিষ প্রয়োগ করে। এতে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২১ আগস্ট আল্লাহর সান্নিধ্যে যাত্রা করেন। ইন্না-লিল্লাহ ও ইন্না ইলাইহি র-জিউন।

 

তাকে হত্যার বিষয়টি আজও রহস্যময়। ইংরেজরা প্রচার করেছে যে তার মৃত্যু স্বাভাবিক নিয়মে অসুস্থ হয়ে হয়েছে, আর একথাই সবমহলে প্রচলিত, কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আজাদের স্মৃতিচারণা থেকে ভিন্ন ধারণা পাওয়া যায়।

 

মাওলানা জহিরুল হককে লেখা চিঠিতে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি সম্পর্কে মওলানা আজাদ বলেন, ‘পঁচিশ বছর নির্বাসন দণ্ড ভোগ করে ১৯৩৯-এ তিনি যখন এখানে আসেন, তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তিনি তার নিজস্ব পরিকল্পনা কংগ্রেসের কাছে পেশ করে সর্বভারতীয় সংগ্রামের প্রোগ্রাম রচনা করেন।

 

সেই সময় গান্ধীজি পর্যন্ত ওই প্রোগ্রামের বিরোধিতা করেন। তার পরেও “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনটুকু অনুমোদন লাভ করে।… শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর বিষ প্রয়োগে মওলানা সাহেবের জীবন শেষ করা হয়।… ১৯৪৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর পুরো এক বছর ন’দিন পর সরকারিভাবে স্বীকার করা হয় মওলানা সাহেব নিহত হয়েছেন।’ (ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান, শেখ আজিবুল হক)

 

চিন্তাদর্শন:

মাওলানা সিন্ধির চিন্তাদর্শনের মূলে ছিল দুইটি বিষয় : (এক) কোরআনের প্রায়োগিক শিক্ষা প্রয়োজন। কেননা কোরআন মানুষের জীবনযাপনের সব সমস্যার জ্ঞানতাত্ত্বিক সমাধানের আকরগ্রন্থ। মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনা প্রকৃত অর্থেই একটি অলৌকিক ব্যাপার।

 

(দুই) অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা প্রতিষ্ঠা করা। কেননা লেনদেন সংক্রান্ত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের সবধরনের কার্যত ও চরিত্রগত অন্যায় ও অন্যায্যতার অন্যতম মূল কারণ আর্থসামাজিক ভারসাম্যহীনতা।

 

তিনি বলেন, ‘যে জাতি কোরআনের নীতির ওপর থাকবে না তারা কখনো কামিয়াব হবে না। আল্লাহর রসুলের সঙ্গী-সাথীরা বিশ্বব্যাপী কোরআন অনুযায়ী নীতিনৈতিকতা প্রচারের পরিকল্পনা করেন, এবং পঞ্চাশ বছরে মানে মাত্র অর্ধশতকে তারা কামিয়াবি হাসিল করেন।

 

এখনো যদি কোনো মুসলমান নীতিনৈতিকতার প্রচারে নামে, তাহলে সে কখনোই কামিয়াব হবে না যদি কোরআন অনুযায়ী সে পরিকল্পনা না হয়। আমার এ বক্তব্য গভীর অধ্যয়নের ফল, এবং বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংগ্রাম-সাধনা পর্যালোচনা করার পর এই বক্তব্যের ওপর আমার ইমান আরও মজবুত হয়েছে। সাধারণত মানুষ জানে রুশ বিপ্লব কেবল একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব। ধর্ম ও পরজগতের সাথে এর কোনো লেনাদেনা নাই। আমি রুশদের কাছে গিয়েছি, এবং তাদের চিন্তাদর্শন পর্যবেক্ষণ করেছি।

 

খুব ধীরে ধীরে, সাজিয়েগুছিয়ে, সূক্ষ্ম কৌশলে ইমাম ওলিউল্লাহ দেহলবির পরিকল্পনা— যা তিনি ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে লিখেন— আমি রুশদের সামনে তা উপস্থাপন করি। রুশরা তখন এই পরিকল্পনা খুবই উন্নত ও প্রগতিবাদী হিশাবে ধরে নেয়।

 

আমাকে জিজ্ঞেস করে : কোনো দল কি আছে যারা এই পরিকল্পনার ওপর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? আমি না-বাচক উত্তর করলে তারা খুব আফসোস করেন, এবং বলেন: যদি কোনো দল এই পরিকল্পনা কার্যকর করত তাহলে আমরাও তাদের সাথে যোগ দিতাম, তাদের ধর্ম গ্রহণ করে নিতাম, এবং এই পরিকল্পনা কৃষকদের মাঝে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি সেই সব সমস্যাবলি সমাধান করত।

 

একথা কোনো রকমের কাটছাঁট ও বিকৃতি না করে সরাসরি ওইসব রুশদের কথার সারসংক্ষেপ। এরপর আমার একিন হয়ে গেছে এই সব লোকেরা কোরআনের পরিকল্পনা অবশ্যই অবশ্যই কোনো একদিন গ্রহণ করতে বাধ্য হবে, একশ বছর পরে হলেও।

 

আজকের পৃথিবীতে এমন কোনো আন্দোলন পাই না যা কোরআনের শিক্ষার বিপরীত, বিপ্লবী রুশরা কোরআনের বিপরীত মতের প্রবক্তা হলেও খুব সম্ভব তারাও কোরআন ও কোরআনের পরিকল্পনার দিকে ফিরে আসবে, আর বাদবাকি আন্দোলনগুলোর কথা বাদই দিলাম।

 

আর এই সব বিষয় আমার ইমানে আরও শক্তি ও নুর তৈরি করেছে যে, হেদায়েত ও সত্য পথে বিজয়ের সুসংবাদ কোরআন নাজিলের পর আল্লাহ তাআলা কেবল কোরআন অনুসরণের ওপর ওয়াকফ করেছেন।’ (ইলহামুর রহমান, পৃষ্ঠা : ৭০)

 

তিনি মনে করতেন মুসলমানদের উন্নত হতে দুনিয়া এবং আখেরাত উভয়কে সামনে রেখে কাজ করতে হবে। জাগতিক ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য ইউরোপের বস্তুবাদকে গ্রহণের জন্যও তিনি আহ্বান করেছিলেন, তবে অবশ্যই আধ্যাত্মিকতা এড়িয়ে গিয়ে নয়।

 

তিনি বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে ইউরোপের এই বস্তুবাদী ইনকিলাবও অদূর ভবিষ্যতে সুনিশ্চিতভাবে মানুষের বৌদ্ধিক ও আত্মিক উৎকর্ষতার ইনকিলাবে পরিবর্তিত হবে। ইউরোপীয়রা এখন যেমন বস্তুগত উন্নতিকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ভাবে, তখন আত্মিক উন্নতিকেও ঠিক তা-ই ভাবতে বাধ্য হবে।

 

নিঃসন্দেহে আমি হালের বস্তুবাদী ইনকিলাব মন ও প্রাণ দিয়ে সমর্থন করি, এবং এবিষয়ে আমার বক্তব্য হলো: ইউরোপীয়দের দুইশ বছরের বিপ্লব ও সংগ্রাম দুনিয়া জুড়ে তন্ত্র মন্ত্র ও যন্ত্রে যে পরিবর্তনের হাওয়া লাগিয়েছে আর বিজ্ঞান যে মোজেজা দেখিয়েছে, তাকে ইনকার করা মানে আমাদের প্রগতির ওই স্তর থেকে অনেক অনেক পেছনে হটে আসা।

 

আমি চাই ইউরোপের এই বস্তুবাদী প্রগতিকে গ্রহণ করে নিতে। অর্থাৎ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নতি আমাদের পার্থিব জীবনের ভিত্তি মজবুত করবে। কিন্তু এর মানে এই নয় বিজ্ঞান আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রের সমাধান বাৎলে দিবে। বিজ্ঞান যে বস্তুগত ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করেছে এ নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই, আমার কথা হলো জীবন স্রেফ বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়।

 

মানুষ অণুর সমষ্টি বটে, কিন্তু অণু রুহের ওপর নির্ভর, এবং সেই রুহ আবার অন্য এক মহাশক্তির ওপর নির্ভর— যিনি ‘হাইয়ুল কাইয়ুম’ (চিরঞ্জীব)। আমি ম্যাটারিয়ালিস্টিকদের বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ধারণাকে ভুল মনে করি না, তবে অবশ্যই অসম্পূর্ণ মনে করি। বস্তুবাদী ধারণা ইনকার করি না, আমি জানি তারা যা বলে তা বস্তুর প্রতিভাস (Phenomenon) সম্পর্কে ঠিক, কিন্তু বস্তুর প্রকৃতরূপ (Noumenon) হলো অবিমিশ্র সত্য— যার জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে আছে, ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘গায়েব’।

 

জীবন সম্পর্কে বস্তুবাদী ধারণা একপেশে ধারণা, একটি দিকের কথাই বলে কেবল, কিন্তু যথাযথ ও পরিপূর্ণ ধারণা আল্লাহর এই কালামে প্রকাশ পায়— হে আল্লাহ, আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখেরাতেও কল্যাণ দাও। (সুরা বাকারা : ২০১) এই ধারণা বস্তুর প্রতিভাস ও প্রকৃতরূপ দুটোকেই শামিল করে, জীবনের জন্য দুটোর প্রয়োজনই সমান প্রমাণ করে।’ (শুউর ও আগাহি, পৃষ্ঠা ৫৩)

 

রচনাবলী:

আত তামহিদ লি-আইম্মাতিত তাজদিদ (বরসগির মেঁ তাজদিদে দীন কী তারিখ)

শাহ ওলিউল্লাহ আওর উন কা ফালসাফা

শাহ ওলিউল্লাহ আওর উন কী সিয়াসি তাহরিক

ফিকরে ওলিউল্লাহ কা তারিখি তাসালসুল

কুরআনি শুউরে ইনকিলাব

শুউর ও আগাহি

কুরআন কা মুতালাআ কেয়সে কিয়া জায়ে

খুতুবাত ও মাকালাতে সিন্ধি

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার ব্যাখ্যাগ্রন্থ

আকিদায়ে ইন্তেজারে মাসিহ

মাকাতিবে মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি

 

 

 

আরও পড়ুন

শিক্ষা  অপরাধ  স্বাস্থ্য  অর্থনীতি  রাজনীতি  আন্তর্জাতিক  খেলাধুলা  লাইফস্টাইল  সারাদেশ

মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক 

মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক 

মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক  মহানায়ক 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.