বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

 

মা শব্দটি অনেক মধুর। মা মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, আপন মানুষ। যার মাধ্যমে পৃথিবীতে আসা। যার কাছ থেকে জীবন সম্পর্কে শেখা। কিন্তু এই মা ই যদি কোন কিছু শেখার আগেই মা হয়ে যান তাহলে।

 

বিশ্বের ইতিহাসে সব চেয়ে ছোট বয়সে মাতৃত্বের রেকর্ড, কথাটি শুনে খানিকটা চমকে যাওয়ারই কথা। এটি কি আদৌ সম্ভব? 

বিশ্বের

বিশ্বে এমন কিছু অনন্য রেকর্ড আছে যা একেবারেই অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি হয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সন্তানের জন্ম দেয় মেয়েটি। যে বয়সে শিশু ঠিকমত নিজের কাজগুলোও গুছিয়ে করতে পারে না।

 

আর সে বয়সেই গর্ভে সন্তান বড় করেছে লিনা মেডিনা।তার জন্ম দেয়া সন্তানটি ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ। গর্ভধারণ অবস্থায় তার বাবা-মা মেয়ের অস্বাভাবিক পেট দেখে মনে করেছিল পেটে বুঝি টিউমার হয়েছে। পরে ডাক্তার জানায়, মেয়েটি গর্ভবতী। এমন খবরে লিনার বাবা-মায়ের মুখের ভাষাও হারিয়ে যায়।

বিশ্বের
পৃথিবীর সবচেয়ে অল্প বয়সে মা হওয়ার তালিকার শীর্ষে রয়েছে লিনার নাম। তার জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর। পেরুর হানকেভ্যালিকায় জন্মগ্রহণ করে সে। লিনাই এখন পর্যন্ত সফলভাবে সন্তান জন্মদানকারিণী সর্ব-কনিষ্ঠ মা।

বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

বিশ্বের

বর্তমানে তার বয়স ৮৬ বছর। তিনি পেরুর লিমা শহরে বসবাস করছেন। ১৯৩৯ সালের কথা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে একটি ছেলের জন্ম দিয়েছিল লিনা। চিকিত্‍সা বিজ্ঞান আজো সেই রহস্যের কিনারা করতে পারেনি।

 

পেরুতে ৭ হাজার ৪০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় বাস ছিল লিনার পরিবার। প্রতিবেশীদের ধারণা ছিল লিনার উপর অশুভ আত্মা ভর করেছে। লিনার বাবা-মা তাকে শামানদের কাছে নিয়ে যান। উপকার না পেয়ে তারা লিনাকে নিকটবর্তী পিসকো শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। ডাক্তার জানায় লিনা সাত মাসের গর্ভবতী।

হাসপাতালের গাইনোকলজিস্ট জেরার্ডো লোজাদা প্রথমে ভেবেছিলেন লিনার পেটে বোধহয় টিউমার হয়েছে। এক্স-রে করানোর পর সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়, এমন কেস দেখে ডাক্তার নিজেও কিছুটা অবাক হন। এত ছোট বাচ্চার মা হবার ঘটনা যে বিরল। নিশ্চিত হবার এরপর লিনাকে পেরুর রাজধানী লিমায় আরো বড় স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়।

 

সেখানে পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হলে লিনাকে নিয়ে বিশ্বে আলোড়ন তৈরি হয়। অধিকাংশ পত্রিকার প্রথম পাতায় ঘটা করে ছাপানো হয় এই সংবাদ। চিকিত্‍সা বিজ্ঞানের মতে, ব্যাপারটি একদমই অসম্ভব। কারণ সাধারণত একজন নারীর পিরিয়ড শুরু হয় ১১-১২ বছর বয়সে।

 

পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগে নারী সন্তান জন্মদানের জন্য প্রস্তুত থাকে না। এরপর চিকিত্‍সক তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, লিনার মাত্র ৩ বছর বয়স থেকেই পিরিয়ড শুরু হয়েছিল।

বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

লিনা গর্ভবতী জানার পরপরই ডাক্তার লোজাদা পুলিশকে ফোন করে তার বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রতিবেশী, পুলিশ এবং ডাক্তারের সন্দেহের তালিকায় প্রথমে তার বাবার নাম ছিল। তবে যথাযথ প্রমাণ না থাকায় পুলিশ তার বাবাকে ছেড়ে দেয়। তার এক মানসিক প্রতিবন্ধী ভাইকেও সন্দেহবশত আটক করা হয়েছিল। তবে তার বিরুদ্ধেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে ঘটনাটি ঘটল কীভাবে?

 

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, লিনার সন্তানের বাবার পরিচয় আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে ডাক্তার এবং পুলিশ মাত্র ৫ বছর বয়সেই গর্ভবতী হওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কিছু কারণ বের করেছিলেন। লিনা প্রায়ই কাপড় ধুতে একা নদীতে যেতো।

 

লিনার বাবা-মা’র ধারণা সেখানেই হয়তো কেউ তার সঙ্গে সহবাস করেছে। অথবা ওই এলাকার লোকেরা নানারকম অদ্ভুত অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। এমন কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েই লিনা হয়তো কারুর মাধ্যমে জোরপূর্বক সহবাসে অংশ নিয়েছে।

 

এক গবেষণায় বলা হয় তিন বছর থেকেই তার নিয়মিত ঋতুস্রাব হতো। অন্য আরেক প্রতিবেদন বলে আড়াই বছর থেকেই তার ঋতুস্রাবের শুরু। এটা কীভাবে সম্ভব? এখানেই শেষ নয়, প্রতিবেদনে বলা হয় চার বছর বয়স থেকেই তার স্তনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হতে থাকে।

 

বয়স যখন পাঁচ বছরের মাঝামাঝি তখন তাকে গর্ভবতী মায়ের মতো দেখায়। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার দেখতে পায় তার মাঝে মা হবার পূর্ণ যোগ্যতা ও সামর্থ্য আছে। যেহেতু সন্তানের বাবা সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না তাই তার শিশু বয়সে মা হবার ক্ষেত্রে দুটি কারণ অনুমান করা যায়- ১. অনাকাঙ্ক্ষিত যৌনতার শিকার; ২. ছেলেটা তার যমজ ভাই।

 

বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

তার গর্ভ থেকে আসা সন্তান কীভাবে তারই যমজ ভাই হতে পারে? ব্যাপারটা একটু চমকপ্রদ। পেটের ভেতর বাচ্চাও সহোদর হতে পারে। এমন বিপত্তিকর শর্তে এমনকি একজন পুরুষের পেটেও বাচ্চা হতে পারে। মায়ের পেটে যখন যমজ সন্তানের উদ্ভব হয় তখন দুটি আলাদা আলাদা ভ্রূণের সৃষ্টি হয়। ভ্রূণ দুটি পাশাপাশি অবস্থান করে। পাশাপাশি অবস্থান করা দুই ভ্রূণের কোনো একটি ভ্রূণ তুলনামূলকভাবে অধিক পরিমাণ খাদ্য-পুষ্টি গ্রহণ করে অপর ভ্রূণের চেয়ে সবল ও বড় আকারের হয়ে যেতে পারে।

 

এমন অবস্থায় কোনোভাবে ছোট ভ্রূণটি যদি বড় ভ্রূণের ভেতরে ঢুকে যায় বা বড়টি ছোটটিকে গ্রাস করে নেয় তাহলে ভেতরে থাকা ভ্রুণটি আর বিকশিত হতে পারে না। ছোটটিকে ভেতরে দমিয়ে রেখে বড়টি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে এবং এক সময় ভেতরে রেখেই মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসে।

 

ছোটটি তখন খাদ্য গ্রহণ করে থাকে বড়টির দেহ হতে। বড়টি যখন বাইরের পৃথিবীতে খেলছে দুলছে তখন ভিতরে ছোটটি অল্প অল্প করে আকারে বাড়ছে। দেখতে দেখতে একসময় সকলে লক্ষ করে খেলাধুলা করে বাড়ানো ছেলে/মেয়েটির পেট ফুলে উঠছে ধীরে ধীরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সকলে মনে করে পেটে টিউমার হয়েছে।

 

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এই পদ্ধতিতে বাচ্চা নারীর পেটেও হতে পারে আবার পুরুষের পেটেও হতে পারে। যেমন- ২০১১ সালের বগুড়ার আব্দুল মালেক এর পেটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। চিকিত্‍সা নিতে যান বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে।

 

ধারণা ছিল এটা টিউমার কিন্তু সেখানে হাসপাতালের ডাক্তারেরা পরীক্ষা করে জানান তার পেটে টিউমার নয়, অসম্পূর্ণ বাচ্চা যেটা তার যমজ। এখানে উল্লেখ রাখা দরকার এসব অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চাগুলো পূর্ণ বিকশিত হয় না, ত্রুটিপূর্ণ ও অবিকশিত হিসেবে জন্ম দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাচ্চা বলতে যা বোঝায় তাও হয় না।

বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব-কনিষ্ঠ মা

১৯৩৯ সালের ১৪ই মে মেডিনা সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেয়। এত অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দেবার মতো উপযুক্ত পেলভিস তার ছিল না। সেই কারণেই সিজারিয়ানের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

 

জন্ম দেয়া পুত্র সন্তানটি সুস্থভাবেই ভূমিষ্ঠ হয়, প্রাথমিক অবস্থায় ভর ছিল আড়াই কেজির উপরে। কিছুদিন পর মেডিনার পরিবার তাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে আসে এবং সিদ্ধান্ত নেয় নবজাতক পুত্র তার মাকে বোন হিসেবে জানবে। ১০ বছর পর্যন্ত সন্তান তার মাকে বোন বলেই ডাকতো। সুস্থভাবেই বেড়ে উঠে কিন্তু ৪০ বছর বয়সে হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করে। উল্লেখ্য মা তথা লিনা মেডিনা এখনো বেঁচে আছে।

 

 

মেডিনা কখনোই তার সন্তানের বাবা কে তা প্রকাশ করেনি বা করতে পারেনি। হয়তো এমন বয়সে বুঝতোও না মা হতে কী কী যোগ্যতা লাগে, সন্তানের জন্য বাবারই বা ভূমিকা কী। এই সন্তানের পিতা কে তা আজ পর্যন্তও জানা যায়নি। এখনো রহস্যই থেকে গেল। উল্লেখ্য মেডিনার বাবাকে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল কিন্তু কোনো তথ্য প্রমাণ না পাওয়ায় পরে ছেড়ে দেয়।

 

পরবর্তীতে মেডিনা একটি হাসপাতালে কাজ করে, হাসপাতালের ডাক্তার যিনি তার সন্তান প্রসব সংক্রান্ত সবকিছু দেখাশুনা করেছিলেন তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছিল। পাশাপাশি মেডিনার সন্তানের লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করেন। বর্তমানে মেডিনা তার স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছেন। স্বামীর নাম রাওল জোরাডো।

 

তার সেই সন্তান জীবিত ছিল ৪০ বছর। সত্যিকার অর্থে কি হয়েছিল লিনার সাথে, কীভাবে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হলো গোটা বিশ্ব- তার আসল কারণ এখনো অজানাই রয়ে গেছে। এতো অল্প বয়সে কীভাবে সন্তান ধারণ সম্ভব তা ধাঁধাই থেকে গেছে।

 

লিনাও এ ব্যাপারটিতে কিছু প্রকাশ করেননি কখনো। ডাক্তারদের কাছে ঘটনাটি শুধু যে বিস্ময়কর তাই নয়, বরং অসম্ভবও বটে।

 

 

 

 

আরও পড়ুন

শিক্ষা  অপরাধ  স্বাস্থ্য  অর্থনীতি  রাজনীতি  আন্তর্জাতিক  খেলাধুলা  লাইফস্টাইল  সারাদেশ

বিশ্বের বিশ্বের বিশ্বের  বিশ্বের  বিশ্বের বিশ্বের 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.