যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালটি বিভিন্ন সমস্যায়

ইয়ানূর রহমান,যশোর : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালটি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম।

বিশেষ করে মেডিসিন ও অর্থোপেডিক বিভাগ নাজুক অবস্থা চলছে। একাধিক মেশিন অচল রয়েছে।

চিকিৎসক, সেবিকা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা চলছেন নিজেদের ইচ্ছামতো। প্রয়োজনের সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না।

বর্তমানে চিকিৎসা ইন্টার্ন নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবার আশায় হাসপাতালে এসে মানুষ বিপাকে পড়ছেন।

কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক সংকট বলে দায় এড়াচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হলো ৫৫ চিকিৎসকের বিপরীতে ৪৫ জনই কর্মরত। আর ডেপুটেশনে রয়েছেন ৮ জন।

সূত্র জানায়, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালটি ২০০৩ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। শয্যার তুলনায় দ্বিগুনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন।

বহিঃবিভাগে চিকিৎসা সেবা নেন গড়ে প্রতিদিন ৯ শ থেকে ১ হাজার । যশোর ছাড়া ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবার আশায় এখানে আসেন। কিন্তু হাসপাতালে আসার পরেই তাদের ধারণা পাল্টে যায়।

সূত্র জানায়, দুপুরের পর থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত ভর্তি রোগীরা কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা পান না। এক বেলা ওয়ার্ড রাউন্ডে এসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা কথা বার্তার মধ্যে রোগী ও স্বজনদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে।

তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রোগ সম্পর্কে জটিল ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের দুর্বল করে ফেলা। পরে কৌশলে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যক্তিগত হসপিটাল ও ক্লিনিকে।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হাসপাতালে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। প্রয়োজনের সময় তাদের ডেকেও দেখা মেলে না।

প্রভাবশালীদের ফোনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগী দেখতে বাধ্য হলে চটে যান। তারা রোগীদের গালমন্দ করেন। রোগীর পক্ষ থেকে বেশি সুপারিশ করা হলে চিকিৎসা না দিয়ে রেফার্ড করে দেন।

বিশেষজ্ঞদের অবহেলায় রোগীর ভাগ্যে ফলোআপ চিকিৎসা জোটে না ঠিকমতো।
ইন্টার্নরা ওয়ার্ড রাউন্ডে এসে ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেন রিপিট অল। অর্থাৎ আগে যে চিকিৎসা ছিলো তাই চলবে।

সূত্র জানায়, রাউন্ডের পর থেকে ওয়ার্ডে কোন গুরুতর রোগী আসলে ইন্টার্নরা দেখভাল করেন। আর রোগীর অবস্থা একটু খারাপ মনে হলেই তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে অন্যত্র রেফার্ড করে দায় এড়ান।

বিশেষজ্ঞদের অবহেলায় রোগীর ভাগ্যে ফলোআপ চিকিৎসা জোটেনা ঠিক মতো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইন্টার্ন জানান, কোন গুরুতর রোগী আসার পর আগে বিশেষজ্ঞের সাথে মোবাইলে কথা বলতেন।

রোগীর শারীরির অবস্থা ভালো করে না শুনেই মোবাইলে নির্দেশনা দেয়া হয় চিকিৎসা দাও, আর যদি খারাপ মনে করো তাহলে রেফার্ড করে দিও।

যে কারণে এখন আর কথা বলেন না। রোগীর অবস্থা বুঝে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রতিটি বিভাগের চিকিৎসা ব্যবস্থা ইন্টার্ন নির্ভর হয়ে পড়েছে।

প্রতিদিন সকালে একবার ওয়ার্ড রাউন্ড দেয়ার পর আর ওয়ার্ডে যান না কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। রোগীর চিকিৎসাসেবা, রেফার্ড, মৃত ঘোষণা সবকিছু করেন ইন্টার্নরা। ব্যক্তিগত বানিজ্যের সুবিধার্থে হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিজেদের মতো করে রোস্টার বানিয়ে নিয়েছেন।

প্রতিটি ওয়ার্ডকে তিনটি ইউনিটে ভাগ করে একেক ইউনিটে চার-পাঁচজন ডাক্তার দায়িত্ব পালন করেন। এক ইউনিটের ডাক্তাররা অন্য রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন না। ইউনিট প্রথা দায়িত্ব ফাঁকি দেয়ার জন্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ট সেবিকা জানান, হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। আগে এমন অবস্থা কখনো চোখে পড়েনি।

যেদিন থেকে এখানে ইন্টার্নরা এসেছেন সেদিন থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলা শুরু করেছেন। বর্তমানে ইন্টার্নরা সব কিছু। কর্তৃপক্ষের সঠিকভাবে জবাবদিহিতা ও কঠোরতা না থাকায় যা ইচ্ছা তাই চলছে।

এমন অবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত। বর্হিবিভাগেও চলছে একই অবস্থা। রোববার দুপুরে অর্থোপেডিক বিভাগের বর্হিবিভাগে দায়িত্ব পালন করছিলেন ইন্টার্ন সুমন। তার সাথে ছিলেন আরও দুইজন সহকারী।

জানা যায়, বর্হিবিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেন না বললেই চলে। ৬ নম্বর কক্ষে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন ইন্টার্ন সিফাত শারমিন ও হাবীবুর রহমান, সুলতানা, ৭ নম্বর কক্ষে শারমিন সুলতানা ১২ নম্বর কক্ষে মেহেদী হাসান, ১৪ নম্বরে জনি ও ১৫ নম্বরে স্বপন।

রোববার বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে রুবিয়া খাতুন। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১২৭৬৮৩/ ৮৩। কথা প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন চিকিৎসা সেবার নামে রোগীদের সাথে চিকিৎসা প্রতারণা করা হচ্ছে।

এসেছিলাম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাবো বলে। কিন্তু ইন্টার্নের চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্যাথলজি বিভাগে ইনকিউবেটর, ওষুধ রাখার ২টি রেফ্রিজারেটর, ১ টি মাইক্রো প্রিপেইড, ১ টি সেন্টিফিউজ মেশিন নষ্ট হয়ে আছে।

মাইক্রোসকোপ আটটির মধ্যে ছয়টি ও ক্লোরোমিটার ২ টির মধ্যে ১ টি নষ্ট। ব্যাংকের ১ টি রোটেটর ও ৪টি রেফ্রিজারেটর নষ্ট হয়ে আছে।

শিশুদের জন্য ৬ টি ইনকিউবেটরের ৪টি নষ্ট। ৪ টি সোলার লাইটের মধ্যে ৩ টি নষ্ট। ১৬টি সাকার মেশিনের মধ্যে নষ্ট ১৫টি। ৮ টি এনেসথেসিয়া মেশিনের মধ্যে অকোজো তিনটি।

ল্যাপারোসকপি মেশিনও নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া ইটিটি, কার্ডিওয়াক মনিটর, কালার ডপলার, ডিজিটাল ইসিজি মেশিন নষ্ট।

এসব হাসপাতালের তত্তবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে ইন্টার্নদের দায়িত্বে বসানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়ে মিটিংও করা হয়েছে।

আগামীতে হাসপাতাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। তিনি আরও জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.