আমরা কখনও ‘জিয়াবর্ষ’ করবো না, কারণ…: সোহেল

দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ‘জিয়াবর্ষ’ কখনোই পালন করা হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মানুষ হিসেবে আমাদের মাঝে রাখতে চাই। নতুন করে জিয়াবর্ষ কখনোই আমরা করবো না, কারণ প্রতিটি বর্ষই বাংলাদেশের জিয়াবর্ষ। শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান অস্বীকার করে আমরা আমাদের এক পা এগুবার কোন অবস্থা নেই। কোথায় যাব? শহীদ জিয়ার অবদান যদি আমরা অস্বীকার করি, তাহলে বাংলাদেশ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।’

শুক্রবার (৬ মার্চ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৪তম কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ফোরাম এই সভার আয়োজন করে।

হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘যতদিন বাংলাদেশে থাকবে, গ্রামে গ্রামে যে গ্রামের কৃষক-গৃহবধূ সন্ধ্যা হলে যখন বৈদ্যুতিক সুইচ দেয় তখন বলবেই শহীদ জিয়া আমাদের মাঝে নেই? বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষক বলবে জিয়া তুমি আজ আমাদের মাঝে নেই। জিয়া বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের প্রতিটি দিনের সম্পদ। প্রতিটি ঘণ্টার সম্পদ। জিয়াউর রহমানের নামে আমরা আলাদা করে বর্ষ কোনদিনও পালন করব না। তাহলে তাকে অপমান করা হবে।’

মুজিববর্ষ উদযাপন নিয়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে এমন অভিযোগ করে সোহেল বলেন, ‘এখন নতুন একটা শুরু হয়েছে বর্ষ। একটা চাঁদাবাজি উৎসব। অফিসে অফিসে চাঁদাবাজি। দোকানে দোকানে এমনিতেই মানুষের ব্যবসা নেই, ছোট ছোট যারা ব্যবসায়ী তাদের যে কি দুরবস্থা, বড় ব্যবসায়ীদেরও অবস্থা ভালো না। এদের কাছে আবার চাঁদাবাজি। নেতাকে ভালোভাবে স্মরণ করেন। সুন্দর ভাবে স্মরণ করেন সমস্যা নাই। নেতার ছবি পিছনের লাগায় রাখলেন, সামনে উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণীরা নাচবে আর বলবে আখ মারে, আখ মারে।’

তিনি বলেন, ‘উনাদের বলতে চাই, দেখেন মানুষকে মানুষের জায়গা রাখেন। মানুষকে দেবতা বানাতে যেয়েন না। ৭২-৭৫ পর্যন্ত আপনাদের নেতাকে এইভাবে দেবতা বানানোর চেষ্টা হয়েছে। পরিণতি কি হয়েছে তা আর বলতে চাই না। আপনাদের মেয়ে তাই বলেছে জাতি আজ ফেরাউন এর হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমাদের কথা নয়। আবার সেই খেলায় মেতেছেন।’

সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি নেতা বলেন, ‘আমাদের ৫৪টি নদীর পানি সমস্যার সমাধান হলো না। কিন্তু নামমাত্র রেভিনিউর বিনিময়ে আমরা ট্রানজিট দিয়ে দিলাম। তাদের (ভারত) স্বার্থ সুরক্ষিত। যে লক্ষ্যে তারা কাজ করছিল সে কাজ সফল হয়েছে এবং এখনো সফল হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়া আমাদের মাঝে নেই। খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে। কিন্তু আমরা আছি। আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশকে ঘিরে আধিপত্যবাদী এই যে শক্তিগুলোর যে ষড়যন্ত্র আমরা শহীদ জিয়ার সৈনিকেরা বেঁচে থাকতে সে স্বপ্ন সফল হতে দেবো না। কারারুদ্ধ করেছেন বেগম খালেদা জিয়াকে। সবাই জানে বেগম খালেদা জিয়া নির্দোষ। অথচ অন্যায় ভাবে তাঁকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।’

সোহেল বলেন, ‘আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা হলেন- বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারের জায়গা, আস্থার জায়গা থাকার কথা। সেই চেয়ারগুলোতে যারা বসছেন তারা কি তাদের শপথ রাখতে পারছেন? আপনারা ওই চেয়ারে বসে লাল টেলিফোনে কথা বলে খালেদা জিয়ার রায় লিখবেন- এমনটি কথা ছিল না। সেদিন একটি মিটিংয়ে আমি দুঃখের সাথে বললাম যে, আমরা দেশ স্বাধীন করলাম, সেই বিচারপতি মোরশেদ উনার মত একজন বিচারক আমরা প্রত্যাশা করতে পারি না। এত বছর দেশ স্বাধীন করলাম জাস্টিস শাহাবুদ্দিনের মতো বিচারপতি এখন আমরা আর দেখি না। এমনকি সিনহা সাহেব যে সাহসিকতা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন সেরকম বিচারপতিও আমরা দেখি না। 

‘বিচারপতির চেয়ারে বসে সবাই গোলামী করছেন। কার গোলামী করছেন? দেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির মাধ্যমে যিনি ক্ষমতা দখল করেছেন। এর চেয়ে বড় দুর্নীতি আর কি হতে পারে? ১০৪ মিলিয়ন মানুষের ভোট আগের রাতে চুরি করে যিনি ক্ষমতা দখল করেছেন তার চেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ কি আর কেউ হতে পারে? সেই দুর্নীতিবাজের টেলিফোনে আপনারা রায় দিচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়া জামিন পাচ্ছেন না। একদিন না একদিন বিচারপতি আপনাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে সোহেল বলেন, ‘ভাইসব আপনাদের বলতে চাই- এ ধরনের মিটিং তো অনেকই হলো। আমরা তো অনেকে ধরনের মিটিং করলাম। মিটিং কেন করে? জনমত তৈরি করার জন্য। জনমত তো তৈরি হয়ে গেছে। জননেতা তারেক রহমান নির্দোষ এটা দেশবাসী জানে। খালেদা জিয়া নির্দোষ এটা নতুন করে জানানোর কিছু নেই। সুতরাং মিটিংয়ের যে কাজ সেগুলো হয়ে গেছে। এই দেশ এখন নতুন একটি গণআন্দোলনের জন্য তৈরি। সেই গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আসলে আমরা কেউই নিজেদের তৈরি করতে পারিনি। এখন যে কাজটি করতে হবে। মিটিং, আচ্ছা ঠিক আছে করেন। কিন্তু রাজপথে নামার মানসিক প্রস্তুতি, খালি নামলেই হবে না, এই নামা নামা না। মিছিলে নামার পরই নীল রংয়ের পোশাক দেখে দৌঁড়ে পালানোর যে টেন্ডেন্সি, এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রুখে দাঁড়ানোর, ঘুরে দারানোর মেন্টালিটি এখন আমাদের তৈরি করতে হবে। মিছিল করলে পারমিশন নিতে হবে তাহলে দেশ স্বাধীন করলাম কেন? আইয়ুব খানের সময়ও তো পারমিশন লাগত কি-না আমি জানি না। এখানে একটুকু ভাই আছেন (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু) সে সময় ছাত্র আন্দোলন করেছেন। আমরা দেশ স্বাধীন করলাম এখন আমাদের পুলিশের পারমিশনের জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয় কখন পারমিশন দেবে। কেন? এটি কি আমাদের দুর্বলতা নয়?’

সোহেল বলেন, ‘আসুন না একটু সাহস করে না নামি। আসুন না আমাদের পিঠে যে বাঁশি বাজায় একটু পিছনে ঘুরে দাঁড়াই দেখি কারা বাঁশি বাজায়? তাদের (প্রশাসন) বলি তোমরা ওই যে তোমাদের যে লাঠি দিয়ে আমাদের মারছো ওই লাঠি আমাদের টাকায় কেনা। যে পোশাকটি তোমরা পড়েছে ওই পোশাকটি আমাদের টাকায় কেনা। যে বুটটি পড়েছ  ওই বুট আমাদের টাকায় কেনা। যে বেতন তোমরা পাও সে বেতনের প্রতিটি টাকা প্রতিটি পয়সা এ দেশের সেই সমস্ত জনগণের টাকায় কেনা যাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ, আসুন আমরা এই ধরনের মিটিং টিটিং কমিয়ে দিই। এবার একটু সাহস নিয়ে আমরা মাঠে নামি। দেখি কার আমাদের বাঁশি বাজিয়ে পিঠে লাঠি মারে। আমরা একটু ঘুরে তাকাই বাবা তুমি কে? কোত্থেকে এসেছ? কবে এসেছ? একটু জিজ্ঞেস করি, জেলে যেতে হলে যাব। আসুন আমরা সবাই এ কাজটা করি। আমরা যদি এভাবে দাঁড়িয়ে যেতে পারি তাহলে কারো অনুকম্পার দরকার নেই ইনশাআল্লাহ বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে চলে আসবেন, আমাদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যাবে কোথায়? কত পুলিশ আছে? কাল তো আঘাত করবেন, করেন, আমরা দেখাতে চাই- আমরা দাঁড়িয়ে থাকবো। এইভাবে যদি আমরা দাঁড়াই। সাধারণ মানুষ শুধু অপেক্ষায় আছে। পরিস্থিতি ঘুরে যাবে। আমাদের নেত্রী মুক্তি পাবে। ইনশাআল্লাহ তারেক রহমান সসম্মানে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। সেদিনের সেই সুন্দর ক্ষণের অপেক্ষায় আমরা থাকলাম।’

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর হেলালের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, সাবেক ছাত্রদল নেতা নাজমুল হাসান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.