ইতিহাসের পাতায় দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে তিন দশক সময় ধরে বেসরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চ শিক্ষা প্রসারে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। উচ্চশিক্ষার বর্ধিত চাহিদা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে মেটানো সম্ভব না হওয়ার কারণেই এই সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বপ্ন দ্রষ্টা অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু করেন ১৯৮০ র দশকে যা ১৯৮৯ সালে একটি কার্যপত্রে রুপ নেয় এবং ১৯৯১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক পরিচালক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডঃ এম আলিমউল্যা মিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনকালে বাংলাদেশের জন্য প্রথম Non-Government University Movement কার্যপত্রটি প্রণয়ন করেন। সেখানে তিনি প্রায় অর্ধশত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকের সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করেন। ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ করার জন্য একটি Letter of Intent to Participate ইস্যু করেন। দেশে ফিরে এসে ডঃ এম আলিমউল্যা মিয়ান ১৯৮৯ সালের ২৭শে জুলাই শিক্ষা মন্ত্রনলায় বরাবর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব জমা দেন। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আইইউবিএটি যাত্রা শুরু করে। সরকার ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন চালু করলে আইইউবিএটি উক্ত আইনে নিবন্ধিত পায়।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেই নয়, আইইউবিএটি দেশে প্রথমবারের মত বিবিএ প্রোগ্রাম চালু করে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ প্রোগ্রাম থাকলেও বিবিএ প্রোগ্রাম ছিল না। সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আইইউবিএটি-ই দেশে প্রথম নার্সিং এবং ট্যুরিজম-হসপিটালিটি বিষয়ে ডিগ্রী প্রোগ্রাম চালু করে। এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আইইউবিএটি-ই প্রথম এগ্রিকালচার ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিগ্রী প্রোগ্রাম চালু করে।

১৯৯৭ সালে আইইউবিএটি অ্যাসোসিয়েশন অফ কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিজ এর সদস্য হয়। উচ্চ শিক্ষায় এই বৈষম্য ও দেশের সর্বস্তরের মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠাতা জ্ঞান ভিত্তিক এলাকা উন্নয়ন কমিউনিটি পর্যায়ে স্বনির্ভরতার একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে প্রতিটি গ্রাম/মহল্লা থেকে একজন করে পেশামুখী গ্রাজুয়েট তৈরি করা। এরই আলোকে প্রায় ৫২৯টি থানা/উপজেলা থেকে আইইউবিএটির শিক্ষার্থী বা গ্রাজুয়েট আছে। আইইউবিএটির থিম হচ্ছে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচ্চশিক্ষা প্রয়োজনে মেধাবী অথচ অস্বচ্ছলদের জন্য অর্থায়ন। An Environment Designed for Learning এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৯৯৮ সালে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় এবং ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৮ সালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গ্রিন ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় ইউআই গ্রিন মেট্রিক ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশে দ্বিতীয় অবস্থান এবং নৈতিক মানবিভাগে বিশ্বের শীর্ষ ৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে আইইউবিএটি। তালিকায় আইইউবিএটির অবস্থান ৪৩ তম।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে, তা প্রমাণিত সত্য। এখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মুখাপেক্ষী না হয়ে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের মুখাপেক্ষী। একজন শিক্ষককে ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সব ধরনের শিক্ষাসংক্রান্ত উপকরণ প্রদান করতে হয়। মোট কথা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কার্যকর নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া চলমান থাকে।

ইউজিসির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে দেশে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ১৬০ এ হিসাবে প্রতি বছরই বেসরকারি বিশব্বিদালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলছে।

একটা সময় ছিলো যখন যেসব শিক্ষার্থীরা সাধারণত কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হতে পারতো না তারাই মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হতো। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। শুধু যে পবালিক বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হতে পারেনি এমন শিক্ষার্থীরা না, এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজের পছন্দ মতো বিষয় পায়নি বলেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ নিজের পছন্দমতো বিষয়ে ভর্তি হয়।

এর মূল কারণ নিজের ভালো লাগার বিষয়ে পড়তে পারা এবং প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষার মান যথেষ্ট ভালো। তাছাড়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ সেশনজটের কোন সম্ভাবনাও থাকে না, যার ফলে নিদিষ্ট সময়ে পড়া শেষ করা যায়। পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দিয়ে থাকে নানা ধরণের বৃওরি সুবিধা। যায় ফলে শিক্ষার্থীরা কম খরচে তাদের উচ্চশিক্ষা সমপন্ন করতে পারে। তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে যায় কারণে শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ভবিষ্যতে আরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। শিক্ষার মান আরো বাড়বে।এতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের প্রবণতা হ্রাসের পাশাপাশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও মেধা পাচার রোধ করা সম্ভব হয়। এমনকি অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে বাংলাদেশে আসছে। এছাড়া, দেশে ও বিদেশে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা ও পেশাজীবী তৈরিসহ বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রুপান্তরিত করার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যার শুরু হয়েছিল আইইউবিএটি প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.