চুয়াডাঙ্গা শহীদ দিবস; মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ইতিহাস হয়ে থাক

১৯৭১ সালের ৫ আগষ্ট ছিলো বৃহস্পতিবার। এদিন চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় শহীদ দিবস। জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি মর্মান্তিক ও অন্যতম স্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এ দিনে জেলার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে শহীদ হন ৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এই দিন সকালে মুক্তিযোদ্ধারা খবর পান পাক-হানাদারদের একটি দল নাটুদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দিকে যাবে। এ সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধরা পাক- হানাদারদের আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় বাগুয়ান গ্রামের শান্তি কমিটির সেক্রেটারি কুবাদ খাঁন সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেয় রাজাকাররা গ্রামের পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঘটনাস্থলে পৌছে দেখেন সেখানে কেউ নেই। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা আফাজ উদ্দিন ফাঁকা গুলি ছোড়ে। জবাবে পাক-হানাদাররা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। নিরুপায় হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তখন পিছু হাটতে বাধ্য হয়।

দুই ঘন্টারও বেশী সময় ধরে চলা যুদ্ধে ৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আটজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন- হাসান জামান, গোকুলখালি, চুয়াডাঙ্গা; খালেদ সাইফুদ্দিন তারেক, পোড়াদহ, কুষ্টিয়া; রওশন আলম, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা; আলাউল ইসলাম খোকন, চুয়াডাঙ্গা শহর; আবুল কাশেম, চুয়াডাঙ্গা শহর; রবিউল ইসলাম, মোমিনপুর, চুয়াডাঙ্গা; কিয়ামুদ্দিন, আলমডাঙ্গা; আফাজ উদ্দিন, চন্দ্রবাস, দামুড়হুদা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট গেরিলা কমান্ডার হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী জয়পুর শেল্টার ক্যাম্পে অবস্থান নেন। এ সময় পাকিস্তান মুসলিম লীগের দালাল কুবাদ খাঁ পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ পাতে।

সে জয়পুর ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীকে খবর দেয় যে, রাজাকারেরা নাটুদা, জগন্নাথপুর ও এর আশপাশের জমি থেকে পাকা ধান কেটে নেয়ে গেছে। দেশপ্রেমের টানে যুবকদের রক্ত টগবগ করে ওঠে।

৫ আগস্ট সকালে পাকিস্তানী দালাল কুবাদ খানের দু’জন লোক চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এসে খবর দেয়, রাজাকাররা তাদের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। রাজাকার ও পাক আর্মিদের শায়েস্তা করতে ৫ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধার দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এলাকায়।

মুক্তিযোদ্ধা হাসান জামানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র নিয়ে বাগোয়ান গ্রামের মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিমে দুই দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হতে থাকেন।

নাটুদহ ক্যাম্পের পাকসেনারা পুর্ব পরিনকল্পনা অনুযায়ী মাঠের আখ ক্ষেতে অ্যাম্বুস অবস্থায় লুকিয়ে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের অ্যাম্বুশের মধ্যে পড়ে যান।

এখানে পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের কৌশলে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে শত্রুকে আক্রমণ করতে থাকেন।

এ অবস্থায় যেকোন একজনকে কাভারিং ফায়ার দিয়ে নিজ দলকে বাঁচাতে হয়। মুক্তিযোদ্ধা হাসান জামান সেই ফায়ারের দায়িত্ব নিয়ে শহীদ হন।

এ সময় অন্য সাথীদের বাঁচাতে সক্ষম হলেও সম্মুখ সমরে শহীদ হন আটজন বীর। ওই সম্মুখ যুদ্ধে আটকা পড়েন বেশ কয়েকজন। অনেকে আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

পরে জগন্নাথপুর গ্রামের মুক্তিকামী মানুষ রাস্তার পাশে দুটি কবরে চারজন করে আটজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মৃতদেহ দাফন করেন। অবশ্য এ সম্মুখযুদ্ধে অনেক পাক আর্মিও হতাহত হয়।

পাক আর্মির নির্দেশে রাজাকারেরা ৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে পাশাপাশি দুটি গর্ত করে কবর দেয়। কালক্রমে এই আটজন মুক্তিযোদ্ধার কবরকে ঘিরেই এ স্থানটির নামকরণ হয়েছে ‘আটকবর’।

দেশমাতৃকার জন্য যারা জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন তাদেরকে বিশেষ এই দিন ছাড়া স্মরণ করা হয় না। দেশের জন্য যারা লড়াই করে, এই লাল সবুজ মানচিত্র এনে দিয়েছে। সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সব সময় ইতিহাস হয়ে থাকুক এমন টায় প্রত্যাশা। শহীদদের পরিবারকে জানাই সশস্ত্র সালাম।

লেখক: জুবায়ের আহমেদ সাব্বির, সদস্য, কেন্দ্রীয় যুবলীগ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.