প্রেষণ ও নিজস্ব কর্মকর্তাদের চরম দ্বন্দ্ব

কয়েক বছর আগে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় এক কর্মকর্তার নাক ফেটে গিয়েছিল। সেই ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। আবারও ঘটল এরকম অপ্রীতিকর ঘটনা।

রোববার সন্ধ্যায় অফিসার্স কল্যাণ সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেনহ তিন কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে চরম হেনস্তা করেন। পরে বোর্ডের অন্য কর্মকর্তারা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। এ বিষয়ে অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঘটনার শিকার তিন কর্মকর্তা।

রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের একজন প্রেষণ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোববার সন্ধ্যার আগে বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন, হিসাব বিভাগের উপপরিচালক বাদশা হোসেনসহ তিন কর্মকর্তা সচিবের কক্ষে সংক্ষিপ্ত সভা করছিলেন।

এ সময় অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হোসেন, মানিক চন্দ্র সেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা জোর করে সচিবের কক্ষে প্রবেশ করেন। অফিসার্স সমিতির নেতারা প্রথমে হিসাব বিভাগের উপপরিচালক বাদশা হোসেনের ওপর চড়াও হন-এই অভিযোগে যে, তিনি কয়েকজন কর্মকর্তার সার্ভিস ফাইলের কাগজপত্র গোপনে ফটোকপি করেছেন। 

এ নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কল্যাণ সমিতির কর্মকর্তাদের চরম বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে কল্যাণ সমিতির নেতারা সচিবসহ তিন কর্মকর্তাকে টেনে-হিঁচড়ে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন। তাদেরকে ভবনের ওপর থেকে নিচে নিক্ষেপ করার জন্য দরজা খুলে দপ্তরের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। খবর পেয়ে অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পুলিশ নিয়ে গিয়ে সচিবসহ তিন কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেন।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হোসেন বলেন, আমরা কোনো কিছুই করিনি। বরং সচিব সাহেব ও হিসাব বিভাগের ডিডি তার কক্ষে আমাদেরকে আটকে রেখে মারধর করেন। অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়েছেন। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম মাত্র। আমরাও সচিবের বিরুদ্ধে বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার চেয়েছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের আরেক প্রেষণ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রাজশাহীসহ সব শিক্ষা বোর্ড একটি অভিন্ন আইন ও অ্যাক্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিছু কর্মকর্তা দুই-তিন বছরের জন্য প্রেষণে আসেন বিভিন্ন সরকারি কলেজের শিক্ষকতা থেকে। আর বোর্ডের নিজস্ব কর্মকর্তারা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী থেকে পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন গ্রেডের অফিসার হন। বোর্ডের প্রেষণ ও নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ১৮ জন এবং সর্বনিম্নে ১২ জন প্রেষণ কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে চেয়ারম্যানসহ আছেন মাত্র ৬ জন। নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে আসা প্রেষণ কর্মকর্তারা মাঝেমাধ্যে নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে হেনস্তার শিকার হন। কোনো প্রতিকার হয় না বলে এখানে তারা অনিয়ম-দুর্নীতির রাজ কায়েম রেখেছেন। তাদের কারণে প্রেষণ কর্মকর্তারা কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারেন না।

জানা যায়, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের আইনানুযায়ী বোর্ডের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উচ্চপদে পদোন্নতির মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ সপ্তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন স্কেল পেতে পারেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে দায়িত্বে থাকা একজন বোর্ড চেয়ারম্যান চাপের মুখে ৯ জন কর্মচারীকে বিভিন্ন উচ্চপদে পদোন্নতি দিয়ে ষষ্ঠ বেতন স্কেল প্রদান করেন, যা আইনবিরোধী।

এদিকে বর্তমান বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোকবুল হোসেনও ৬ জন নিজস্ব কর্মচারীকে পদোন্নতি দিয়েছেন। আইন ও বিধিবিরোধী হওয়ায় তাদের উচ্চ গ্রেডের বেতন স্কেল অনুমোদন না করে আটকে রেখেছেন বোর্ড সচিব। এ নিয়েই মূলত বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও হিসাব বিভাগের উপপরিচালকের সঙ্গে কল্যাণ সমিতির নেতাদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সর্বশেষ রোববার সন্ধ্যায় সার্ভিস বুকের কাগজ ফটোকপির অজুহাত তুলে প্রেষণ কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হন কল্যাণ সমিতির নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ওইদিন খুব খারাপ ঘটনা ঘটেছে আমাদের সঙ্গে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছি। চেয়ারম্যান এর প্রতিকার করবেন বলে আশা করি।

ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোকবুল হোসেন বলেন, বিষয়টি দেখছি। জরুরি সভায় আছি। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাব।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.