Tue. Nov 19th, 2019

চুয়াডাঙ্গায় আমনের ভরাক্ষেতে কারেন্ট পোকার আক্রমনঃ দিশেহারা কৃষক

 চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ    চুয়াডাঙ্গার মাঠে মাঠে আমন ধানের ক্ষেতে বাদামি গাছ ফড়িং বা কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে জেলার সব উপজেলার মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের জমিতে পোকার আক্রমণে ধান শুকিয়ে যাচ্ছে। অনেকের আক্রমন শুরু করেছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে জেলার কৃষকরা। এ পোকার আক্রমণে চলতি আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামের আরাফাত আলী ২৫ কাঠা জমি বছরে ১০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে আমন ধানের চাষ করেছিলেন। ঠিকমত পরিচর্যার মাধ্যমে ক্ষেতের ধানও হয়েছিল ভালো। তার আশা ছিল ক্ষেতের ধান ঘরে তুলে সব দায়দেনা পরিশোধ করবেন। কিন্ত ভরা মৌসুমের শেষের দিকে এসে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কেননা হঠাৎ কারেন্ট পোকার আক্রমনে ক্ষেতের ধান গাছ শুকিয়ে বাইলের সবধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করেও পাচ্ছেন না কোন সুফল। একই গ্রামের গরীব কৃষক আমিনুল ইসলাম মাত্র ১০ কাঠা জমিতে শুধুমাত্র পরিবারের চাহিদা মেটাতে আমন ধানের চাষ করেছিলেন। ক্ষেতের ধান গাছের শিষও বের হয়েছিল। কিন্ত হঠাৎ করেই ক্ষেতের মাঝে মাঝে ধানগাছগুলো মরে শুকিয়ে গাছের সব ধান চিটা হয়ে গেছে। কানাইডাঙ্গা গ্রামের জয়নাল আবেদীন, ১৫ কাঠা জমির ধানক্ষেত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন খরচের টাকাও আসবে না। বুইচিতলা গ্রামের কলিম উদ্দীন বুইচিতলার কলিম উদ্দীনের ক্ষেতের অবস্থা একই। শুধু এদের ক্ষেতই নয় চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদার সকল মাঠেই বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে গেছে কারেন্ট পোকা। কৃষিকর্মকর্তারা বলছেন আবহাওয়াজনিত কারনে (বি,পি,এইচ) বা কারেন্ট পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে। কিন্ত কৃষকদেরকে পরামর্শ দেওয়ার কারনে এখনও ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। জেলা কৃষি অফিসসূত্রে জানাগেছে, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় আমন ধান রোপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৭ হাজার ৩৯৫ হেক্টোর। কিন্ত চাষ হয়েছে ৪০ হাজার ৫’শত ৫০ হেক্টোর জমিতে।
সরেজমিনে উপজেলার কুতুবপুর-মুন্সিপুর, কানাইডাঙ্গা, জুড়ানপুর, হেমায়েতপুর, কুড়ুলগাছি, চন্ডিপুর, সাড়াবাড়িয়া, বড়বলদিয়া, বুইচিতলা, হরিশ্চন্দ্রপুর, ফুলবাড়ি, প্রতাপপুর, ঠাকুরপুর, মদনাসহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মাঠের আমন ক্ষেতে বিক্ষিপ্তভাবে কারেন্ট পোকা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষেত বাঁচাতে কৃষকেরা কীটনাশক স্প্রে করছেন। কীটনাশক কোম্পানীর প্রতিনিধিরাও দিচ্ছেন নানান পরামর্শ। ক্ষতিগ্রস্থ উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের কৃষক আক্তারুল জানান, আগের দিন বিকালে ভালো ক্ষেত দেখে পরের দিন বিকালে গিয়ে দেখি ক্ষেতের মাঝে মাঝে বেশ খানিক স্থান জুড়ে পাকা ধানের মত রঙ ধারন করে ধানগাছ শুকিয়ে গেছে। আক্রান্ত ধানগাছগুলোর বাইলের সব ধান চিটা পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি একজন বর্গাচাষী। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে ধানচাষ করেছিলাম। এখন ক্ষেতের এমন অবস্থা। কিভাবে সারা বছর সংসার চালাবো সেই চিন্তায় পড়েছি। কথা হয় ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করা সদাবরী গ্রামের কৃষক আলম হোসেনের সাথে। তিনি জানান, আমাদের মাঠের অনেকের ক্ষেতে কারেন্ট পোকা লেগেছে। আমার ক্ষেতেও কিছু কিছু জায়গায় দেখা যাচ্ছে। সে কারনে ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করছি। তিনি বলেন, সারাবছর পয়সা খরচ করে চাষ করে এখন ভরা ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। এর চেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারেনা। দামুড়হুদা কৃষি অফিসের এ কৃষিকর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহের কয়েকদিনের গরমের পর বর্ষা হয়েছে। এরপর দিনের বেলায় ভ্যাপসা গরমের শেষে রাতে ঠান্ডা পড়ার কারনে ধানক্ষেতে (বিপিএইচ) বা বাদামী গাছ ফড়িং রোগ দেখা দিয়েছিল। কৃষকদের ভাষায়, এটাই কারেন্ট পোকা রোগ। তিনি বলেন, ক্ষেত প্রথম দিকে আক্রান্ত হলেও বর্তমানে নিয়ন্ত্রনে। তিনি আরও বলেন, ঠান্ডা গরম মিশ্রিত আবহাওয়ায় স্যাঁতসেতে জমিগুলোতে আক্রমনটা বেশি দেখা যায়। তিনি বলেন, প্রথম দিকে এ পোকা ধানগাছের গোড়ায় বাসাবেধে বংশবিস্তারের পাশাপাশি শুড় দিয়ে গাছের গোড়ার নরম কান্ডে ছিদ্র করে দেয়। এতে ধান গাছের হরমোন ক্ষয় হতে থাকে। ২য় পর্যায়ে গাছের কান্ডের ছিদ্র দিয়ে জাইলেম ফ্লোয়েম সিল হয়ে গিয়ে মাটি থেকেও খাদ্যরস নিতে পারে না গাছ। সর্বশেষ ৩য় পর্যায়ে এসে হঠাৎ করেই ধানগাছগুলো শুকিয়ে বাইলের সকল ধান চিটা হয়ে যায়। তিনি বলেন, এ পর্যায়ে আর কিছু করার থাকে না। দামুড়হুদা উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, বিভিন্ন কৃষকের ক্ষেতের বিপিএইচ রোগের কথা শুনেছেন। দিনের বেলায় গরম আর রাতে ঠান্ডা এমন আবহাওয়ায় এ রোগ দেখা দিয়েছিল। কিন্ত কৃষকদেরকে সচেতন করার কারনে ব্যাপক আকার ধারন করতে পারেনি। তিনি বলেন, আক্রান্ত ক্ষেতে প্লেনাম, হুপারসট, সপসিন , নিপসিন ক্ষেতে স্প্রে করতে কৃষকদেরকে পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ঠান্ডা পড়া শুরু হলে বিক্ষিপ্ত এ আক্রমন থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *