Tue. Feb 18th, 2020

আজ মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের প্রয়াণের ৬ বছর

যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের পথিকৃত খ্যাত, যার অসাধারণ অভিনয়, সৌন্দর্য আর প্রতিভা দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রকে অলংকৃত করেছেন। ব্যক্তিজীবনে সব পুরুষেরই একজন স্বপ্নের নায়িকা থাকে। কারো কারো জীবনে স্বপ্নের নায়িকা স্বপ্নেই থেকে যায়, অনেকেই তাকে বুকের ভেতর লালন করেন আমৃত্যু। তিনি আর কেউ নন, উপমহাদেশের কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্নের মহানায়িকা সুচিত্রাসেন। আজ শুক্রবার ১৭ জানুয়ারি। মহানায়িকা সুচিত্রাসেনের প্রয়াণের ছয় বছর। ২০১৪ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা সুচিত্রাসেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর

দিবসটি পালনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায়, পাবনা জেলা প্রশাসন ও সূচিত্রাসেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আয়োজনে পাবনার এই কন্যার শৈশব বিদ্যাপীঠ পাবনা টাউন গালর্স হাইস্কুল (তৎকালিন মহাকালী পাঠশালা) প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে সুচিত্রাসেন স্মরণসভা। এছাড়াও সুচিত্রাসেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে পাবনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত সভায় উপস্থিত থাকবেন ভারতীয় হাই কমিশনার রাজশাহীর সহকারি হাই কমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটি। এদিকে বিকেলে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালায় চলচ্চিত্র প্রদর্শণ করা হবে। 

ভক্তরা জানান, মহানায়িকা সুচিত্রাসেন উপমহাদেশের নায়ক-নায়িকা ও অভিনয় শিল্পীদের আদর্শ, বাঙালির গর্ব। তার সততা, নিষ্ঠা, আদর্শবাদিতা একাগ্রতা স্মরণীয় ও শিক্ষণীয়। একজন সফল নায়িকা হিসেবে তিনি জীবনের জয়গান গেয়েছেন সর্বত্র। তার মতো নায়িকা হাজার বছরে একজন জন্মায়। সুচিত্রাসেন তার অভিনয় শৈলী ও দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের আইকন। বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক জনপ্রিয় ধারার পথিকৃত। বিস্ময়কর এক ইতিহাসের নাম সুচিত্রাসেন।  

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৩১ সালের ৫ এপ্রিল তৎকালের বৃহত্তর পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলা) বেলকুচির সেনভাঙার জমিদার বাড়িতে রমা দাশগুপ্ত জন্ম নেন। যিনি পরবর্তীতে সুচিত্রাসেন নামে পরিচিত হন। তিনি কৃষ্ণা দাশগুপ্ত হিসাবেও বন্ধুদের কাছে পরিচিত ছিলেন। পরে পাবনা শহরের দিলালপুরের বাড়িতে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। সুচিত্রাসেন পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের (তৎকালীন মহাকালী পাঠশালা) ছাত্রী ছিলেন। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গে চলে যান তারা।

সুচিত্রাসেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন তৎকালের পৌরসভার ট্যাক্স কালেক্টর ও মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত একজন গৃহবধু। বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান এবং তৃতীয় কন্যা ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে  বিশিষ্ট শিল্পপতি দিবানাথ সেন-এর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন সুচিত্রাসেন। ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে তার প্রথম মুক্তি প্রাপ্ত বাংলা ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’। ঐ বছরেই উত্তম কুমারের সঙ্গে তার প্রথম মুক্তি প্রাপ্ত ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। বাংলা ছবির এক অবিসংবাদিত জুটি হিসেবে পরবর্তী ২০ বছরে উত্তম-সুচিত্রা ছিলেন আইকন স্বরূপ।

১৯৫৫ সালে হিন্দি ভাষায় ‘দেবদাস’ ছবিতে অভিনয় করেন সুচিত্রাসেন। ১৯৭৪ সালে ‘আঁধি’ নামে আরেকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এই ছবিতে একজন রাজনীতিকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল সুচিত্রাকে। সর্বমোট সাতটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি, এছাড়া একটি তামিল ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। উত্তমকুমারের সঙ্গে তার শেষ অভিনীত ছবি হীরেন নাগ পরিচালিত ‘প্রিয়বান্ধবী’, সেটি মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরগ্রহণ করেন।

‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে তিনি প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। ভারত সরকার তাকে ১৯৭২ সালে “পদ্মশ্রী” পুরস্কারে ভূষিত করেন এবং ২০০৫ সালে তাকে “দাদা সাহেব ফালকে” পুরুস্কারে ভূষিত করেন। কিন্তু তিনি ওই পুরস্কার নিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করেছিল। সেসময় মেয়ে মুনমুন সেন তার মায়ের হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। মহানায়ক উত্তম কুমার এর মত্যুর পরে তিনি তাকে ফুল দিতে গিয়েছিলেন। তারপর একবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান।

মহানায়িকা সুচিত্রাসেনের পৈতিক ভিটা পাবনা শহরের হীমসাগর লেনের বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত ইমাম গাযযালী ট্রাস্ট দখল করে ছিল। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর ২০১৫ সালের দিকে বাড়িটি জেলা প্রশাসন দখল মুক্ত করে। পরে বাড়িটি সুচিত্রাসেন স্মৃতি সংগ্রহশালা করা হয়েছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহি বিদ্যাপীঠ খ্যাত পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের একটি ছাত্রী হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘সুচিত্রাসেন হল’।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *